আফগানদের ভাতে মারতে নিজেই পথে পাকিস্তান

Spread the love

আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের আবহে পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিস পাবলিক রিলেশন বিভাগের ডিজি তথা লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেছিলেন, ‘রক্ত এবং ব্যবসা একসঙ্গে চলতে পারে না।’ তারপর থেকে দুই পড়শি দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক কার্যত ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু পাকিস্তান বিভিন্ন মানদণ্ডে গরিব দেশ আফগানিস্তানকে ভাতে মারার চেষ্টা করলেও আদতে কাবুলের ব্যবসা বহাল তবিয়তেই চলছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে কার্যত চোখের জলে নাকের জলে পাকিস্তান।

১১ অক্টোবর থেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার পরেই কাবুলের তালিবান শাসিত সরকার দ্রুত ইরান ও ভারতের থেকে পণ্য সামগ্রী আমদানি শুরু করে। কিন্তু পাকিস্তান পড়েছে বড়সড় বেকায়দায়। এমনিতেই পাকিস্তানের অর্থনীতির হাল বেহাল। তারই মধ্যে ইসলামাবাদের এই সিদ্ধান্তে মাথায় হাত পড়েছে পাক ব্যবসায়ীদের। করাচি-ভিত্তিক সংবাদপত্র ডন-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ফলে পাকিস্তানের ব্যবসা, আমদানি ও রফতানি খাত ভয়ঙ্কর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার জেরে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন পাক ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়ার ব্যবসায়ীরা এখনই ব্যবসার জন্য বর্ডার খোলার দাবি শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, গত সপ্তাহে পাক ব্যবসায়ীদের একাংশ সে দেশের রাজনৈতিক দল জমিয়ত উলেমা-ই-ইসলামের প্রধান মৌলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। দ্রুত সীমান্ত খুলে দিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পুনরায় চালু করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

কাবুলের আরিয়ানা নিউজ-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৪৫ দিন ধরে ডুরান্ড লাইন দিয়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন করা বন্ধ রেখেছে পাকিস্তান। যার জেরে কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে পাক ব্যবসায়ীদের। পাকিস্তানের সাংবাদিকেরাও দাবি করছেন, পাক সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিজেদের জন্যই বুমেরাং হয়ে উঠেছে। ইসলামাবাদের হঠকারি সিদ্ধান্তের ফলে শুধু যে পাক ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তা নয়, বাজারে বেড়ে গিয়েছে একাধিক জিনিসের দাম। যার ফলে মহাসমস্যায় পড়েছেন পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিকেরাও। সোশ্যাল মিডিয়াতেও পাক নেটিজেনরা এমন সিদ্ধান্তের জন্য শাহবাজ শরিফের সরকারকে তুলোধনা করতে ছাড়ছেন না। একাধিক ভাইরাল ভিডিওতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, রফতানি বন্ধ হওয়ার ফলে কাঁচা সবজির বাজারে স্তুপাকৃত হয়ে পড়েছে বহু সামগ্রী। এই পরিস্থিতিতে সুর নরমের ইঙ্গিত দিয়েছে পাকিস্তান। আফগানিস্তানের ‘টোলো নিউজ’ পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী তথা উপ-প্রধানমন্ত্রী ইশাক দারকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই নাকি রাষ্ট্রসংঘ ইসলামাবাদকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আর্জি জানিয়েছে। তারপরেই বিষয়টি নিয়ে পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী দার।

সম্প্রতি ভারতে এসেছিলেন আফগানিস্তানের তালিবান সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী আলহাজ নুরুদ্দিন আজিজি। তিনি ভারতের বণিকমহলের কাছে আফগানিস্তানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও বেশি করে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। পাকিস্তানকে এড়িয়ে বাণিজ্য চালিয়ে গেলে তাদের কোনও অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে না বলে মনে করছে কাবুল।

পাকিস্তানে সিমেন্ট-ওষুধ শিল্পে ভয়াবহ প্রভাব

আফগান সীমান্ত বন্ধ থাকায় পাকিস্তানে বাণিজ্যিক আমদানি এবং রফতানি, দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করার ফলে পাকিস্তানে সিমেন্ট ও ওষুধ শিল্পে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। ডনের প্রতিবেদন অনুসারে, কাবুল থেকে কয়লা আমদানি বন্ধ হওয়ার দরুণ পাক ব্যবসায়ীদের দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, মুজাম্বিকের মতো দেশ থেকে অনেক বেশি দামে কয়লা কিনতে হচ্ছে। যার জেরে পাকিস্তানে প্রতি টন কয়লার দাম ৩০ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৫ হাজার টাকা। পাকিস্তানে সিমেন্ট শিল্প অন্যগুলির তুলনায় বেশ উন্নত। সিমেন্ট উৎপাদনের জন্য কয়লা জরুরি। কিন্তু তার দাম বাড়ায় মাথায় হাত পড়েছে ব্যবসায়ীদের। কার্যত একই অবস্থা মেডিক্যাল সেক্টরেও। পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি আফগানিস্তানকে কয়েকশ মিলিয়ান ডলারের ওষুধ সরবরাহ করত। কিন্তু বর্ডার বন্ধ হওয়ার ফলে বিপুল পরিমাণে ওষুধ গুদামেই পড়ে রয়েছে। এমনকী সেই ওষুধগুলি দেশে বিক্রির জন্য স্বীকৃত না হওয়ায় সেগুলি পাকিস্তানেও বিক্রি হচ্ছে না। ফলে মহা ফাঁপরে পড়েছে পাক ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি।

সবজি ও ফল ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষতি

পাকিস্তান নিয়মিত ভাবে আফগানিস্তানে শুকনো ফল, শাকসব্জি এবং ওষুধ রফতানি করত। বাণিজ্য প্রায় পুরোপুরি বন্ধ থাকায় এই পণ্যগুলির রফতানিও স্থগিত হয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি হওয়ায় পড়ে থেকে থেকে ফল-সব্জি পচে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাকিস্তানের আফগান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে পাকিস্তানে আমদানি করা ফলের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে, যার ফলে ক্রেতাদের অনেক বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, কয়েক দিন আগে তালিবান সরকারের উপ প্রধানমন্ত্রী মোল্লা গনি বরাদর জানিয়েছেন, পাকিস্তানকে এড়িয়ে বিকল্প বাণিজ্যপথের সন্ধান করতে হবে। যে ব্যবসায়ীরা তারপরেও পাকিস্তানের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি চালাবেন, তাঁদের কোনও সমস্যায় তালিবান সরকার পাশে দাঁড়াবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

পাঠানদের তীব্র প্রতিবাদ

আফগান সীমান্ত বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পাকিস্তানের আফগান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের পাঠান ব্যবসায়ীরা। খাইবার পাখতুনখোয়ার পাঠানরা এখনই বর্ডার খোলার সিদ্ধান্ত নিতে পাক সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু ‘বিপদে বুদ্ধিনাশ’ অবস্থা হয়েছে পাকিস্তানের। আর যার ফলে হাড়ে হাড়ে টের পেতে হচ্ছে আম পাক জনগনকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *