গণতন্ত্র ফেরানোর আন্দোলন: কারাগারে প্রাণ গেছে ২৭৩ জনের

Spread the love

মিয়ানমারে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন হাজারো তরুণ। কিন্তু তাদের অনেকেরই ঠিকানা হয়েছে কারাগার। আর সেখানেই নিঃশেষ হয়ে গেছে বহু তাজা প্রাণ। জান্তা সরকারের হাতে আটক হওয়ার পর অন্তত ২৭৩ জন বন্দি কারাগারে মারা গেছেন। এর মধ্যে তরুণ বয়সি অন্তত ৭৪ জন।শনিবার (৩১ জানুয়ারি) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত কারাগারে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। 

রয়টার্স এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি) এবং পলিটিক্যাল প্রিজনার্স নেটওয়ার্ক অব মিয়ানমারের (পিপিএনএম) দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে। এছাড়া আটক শিক্ষার্থীদের স্বজন, সহযোগী এবং কারাগার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর সাক্ষাৎকার ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কারাগারে নিহত ৭৪ জন বন্দির বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। মিয়ানমারের কারাগার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা পিপিএনএম-এর তথ্যমতে, অভ্যুত্থানের পর জনমনে উসকানি ও বিদ্রোহের অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে মোট ২৭৩ জন বন্দি কারাগারে মারা গেছেন।

রয়টার্স স্বাধীনভাবে সব মৃত্যুর কারণ যাচাই করতে না পারলেও, এই ভয়াবহ চিত্র জাতিসংঘের তদন্তকারীদের আগের প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলে যায়। গত বছর জাতিসংঘ জানিয়েছিল, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর পরিচালিত আটককেন্দ্র ও কারাগারগুলোতে পদ্ধতিগত নির্যাতন, হত্যা এবং অন্যান্য গুরুতর অপব্যবহার চলছে। যদিও জান্তা সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দাগন ইউনিভার্সিটির প্রাণিবিদ্যার শিক্ষার্থী উট ই অং-এর মর্মান্তিক পরিণতির কথা। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেফতারের পর বিদ্রোহের অভিযোগে তাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়ে কুখ্যাত ইনসেইন কারাগারে পাঠানো হয়। 

পরিবারের অভিযোগ, আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মাথায় গুরুতর আঘাত করা হয়। কারাগারে চিকিৎসার অভাবে তার স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৫ বছর বয়সে গত বছরের ১৯ জুলাই কারাগারে তার মৃত্যু হয়। কর্তৃপক্ষ হৃদরোগের কথা বললেও ছাত্র ইউনিয়ন ও স্বজনদের দাবি, চিকিৎসার অভাবেই তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে।

আরেকটি ঘটনায় ১৯ বছর বয়সি শিক্ষার্থী খান্ত লিন নাইংয়ের মৃত্যুর বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২১ সালে গ্রেফতারের পর তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে কারা কর্তৃপক্ষ চিঠি দিয়ে তার পরিবারকে জানায়, কারাগার পরিবর্তনের সময় পালানোর চেষ্টা করলে গুলিতে তিনি নিহত হন। 

তবে মানবাধিকার কর্মী ও তার পরিবারের ধারণা, তাকে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে। কারণ, বন্দিদের স্থানান্তরের সময় সাধারণত কড়া পাহারা ও হাতকড়া পরানো থাকে, ফলে পালানোর চেষ্টা করা প্রায় অসম্ভব। ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তার পরিবার লাশ ফেরত পায়নি, এমনকি কোনো শেষকৃত্যও করতে পারেনি।

জাতিসংঘের মতে, মিয়ানমারের এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির তরুণ প্রজন্ম। গ্রেফতার, নির্যাতন এবং জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ভয়ে লাখো তরুণ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। 

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) হিসাবে, অভ্যুত্থানের পর থেকে ৩ থেকে ৫ লাখ তরুণ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। শিউ থেইঙ্গি নামের এক তরুণী রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের একেকজনের একেক রকম স্বপ্ন ছিল। আমি সংবাদ উপস্থাপক হতে চেয়েছিলাম, আর আমার বন্ধুরা চেয়েছিল সমাজসেবা করতে। কিন্তু সব স্বপ্ন এখন ফিকে হয়ে গেছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *