দেখতে দেখতেই আরও একটা বছর শেষ। নতুন বছর দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। ২০২৫ বছরটা বর্ণময় ছিল। আর চলতি বছরেই পহেলগাঁও হামলার জবাবে ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযান থেকে পাকিস্তানকে প্রত্যাঘাত- সব মিলিয়ে নিজেদের রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরল ভারতীয় সেনা। সেনার তরফে জানানো হয়েছে, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি অভিযানের অভিজ্ঞতা, দ্রুত আধুনিকীকরণ, নিখুঁত আঘাতের সক্ষমতা, ড্রোন ও আনম্যানড সিস্টেমের বিস্তার এবং তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়, এই সব কিছুর সমন্বয়ে ২০২৫ হয়ে উঠেছে ভারতীয় সেনার ‘ফিউচার-রেডি ফোর্স’-এ রূপান্তরের নির্ধারক বছর।
২০২৫ সালে সীমান্ত পেরিয়ে মোট ন’টি জঙ্গি শিবির ধ্বংস করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছে ভারতীয় সেনা এবং দু’টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে ভারতীয় বায়ুসেনা। সেনা সূত্রে দাবি, এই স্ট্রাইকগুলি ছিল নির্ভুল, সময়বদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত, যাতে একদিকে শক্ত বার্তা দেওয়া যায়, অন্যদিকে সংঘর্ষের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। ৭ থেকে ১০ মে রাতে পাকিস্তানের তরফে ড্রোন ব্যবহার করে ভারতীয় সামরিক ও অসামরিক পরিকাঠামোয় হামলার চেষ্টা করা হলে, সেনার এয়ার ডিফেন্স ইউনিট তা সফলভাবে প্রতিহত করে। এতে সমন্বিত কাউন্টার-ইউএএস এবং স্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা কার্যত প্রমাণিত হয়েছে। এই ঘটনায় কোনও হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, যার এই অভিযানের সাফল্যকে তুলে ধরে।
একই সঙ্গে লাইন অব কন্ট্রোলে স্থলভিত্তিক অস্ত্র ব্যবহার করে একাধিক জঙ্গি লঞ্চপ্যাড ধ্বংস করা হয়, যার ফলে অনুপ্রবেশের রুট ও জঙ্গি রসদ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা লাগে। এই ক্রমবর্ধমান চাপের জেরে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বকে উত্তেজনা কমাতে বাধ্য করে। শেষ পর্যন্ত ১০ মে পাকিস্তানের ডিজিএমও ভারতের ডিজিএমও-র সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যার পর সামরিক পদক্ষেপ ও সংঘর্ষবিরতি নিয়ে একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়। তবে ভারতের তরফে আগেই জানানো হয়েছে যে ‘অপারেশন সিঁদুর’ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ‘অপারেশন সিঁদুর’ ভারতের জন্য কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বহির্শত্রুর আক্রমণ মোকাবিলা করতে আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে ভারত। বহুদূরের লক্ষ্যে আঘাত হানার ক্ষেত্রে সামরিক দক্ষতা যেমন প্রমাণ করেছে ভারত, তেমনই সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দাদের মধ্যে সমন্বয়ও নজর কাড়ে। তবে পুরো অভিযানটি ভারত চালিয়েছে নিজেদের এয়ারস্পেস থেকেই। আগের মতো সার্জিক্যাল বা এয়ারস্ট্রাইকের পদ্ধতিতে নয়। ভারতের মাটি থেকে দাঁড়িয়েই চিহ্নিত জায়গাগুলিতে হামলা চালানো হয়েছে।

আর তাতে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। রয়েছে স্ক্যাল্প ক্রুজ মিশালই, হ্যামার বোমা। এমনকী ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীনই বরাবর প্রথম পরমাণু শক্তি ব্যবহার না করার পণ থেকেও সরে আসে ভারত। পাকিস্তানের পরমাণু হুমকি যে বরদাস্ত করা হবে না, স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়।‘অপারেশন সিঁদুর’ শুধুমাত্র সামরিক অভিযান নয়, এটি ভারতের নীতি, অভিপ্রায় ও সিদ্ধান্তমূলক ক্ষমতার ত্রিমুখী সমন্বয়। ভারতের সশস্ত্র বাহিনী পাকিস্তানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে-সন্ত্রাসবাদীদের জন্য আর কোনও নিরাপদ আশ্রয় নেই। ‘অপারেশন সিঁদুরের’ সাফল্য দেশের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে, দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেছে, ভারতের সীমান্তকে সুরক্ষিত করেছে এবং ভারতের গৌরবকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ভারতীয় সৈনিকেরা নিখুঁত নির্ভুলতা ও দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে তাদের লক্ষ্য পূরণ করেছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দেশের নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে, ২০২৫ সাল ভারতীয় সেনার কাছে শুধুমাত্র একটি ক্যালেন্ডার বছরের বেশি কিছু-এই বছরেই আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতায় নিজেদের নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে বাহিনী, শক্তিশালী করেছে প্রতিরোধ ক্ষমতা, প্রস্তুতি ও আত্মনির্ভরতার ভিত।