রাশিয়ার সাখালিন অঞ্চলের মানুষ কি সকালের আকাশে ভাসতে থাকা ‘দুটি সূর্য’ দেখেই ঘুম থেকে জেগে উঠেছিল? সাখালিনের এক বাসিন্দার ধারণ করা একটি ভিডিওতে এমনই এক বিরল দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে মনে হবে আকাশে ‘দুটি সূর্য’ উঠেছে। ভিডিওটি ধারণ করা ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘এটা এক ধরনের মজা মনে হচ্ছে। দুটি সূর্য উঠেছে’। কিন্তু ভাইরাল ওই ভিডিওর পেছনের সত্যটা কী?
রাশিয়ায় ঘটে যাওয়া এই বিরল ঘটনার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘সানডগ’ বা ‘পারহেলিয়ন’।
সানডগ কী?
সানডগ হলো একটি বায়ুমণ্ডলীয় আলোকীয় প্রভাব। এটি এক ধরনের ‘আইস হ্যালো’। এটি তখনই ঘটে যখন আলোর রশ্মি বরফের স্ফটিকের একপাশ দিয়ে প্রবেশ করে এবং প্রথম দিকটির সঙ্গে প্রায় ৬০ ডিগ্রি কোণে অবস্থিত আরেক পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসে।
গবেষণা সংস্থা নাসার মতে, সূর্য আকাশে নিচু অবস্থানে থাকলে সানডগ সবচেয়ে সহজে দেখা যায়। এই ‘হ্যালো’গুলো সূর্যের দুই পাশে প্রায় ২২ ডিগ্রি দূরত্বে সৃষ্টি হয়। সানডগের যে অংশটি সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকে সেখানে সবসময় লাল রঙের স্তর দেখা যায়, আর তার বাইরের দিকে সবুজ ও নীল রঙ গঠিত হয়। ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যাই হোক না কেন, সানডগ পৃথিবীর যেকোনো স্থানে এবং বছরের যেকোনো সময় দেখা যেতে পারে।
ব্রিটানিকার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সানডগ হলো সূর্যের পাশে দেখা যাওয়া একটি উজ্জ্বল আলোর স্পট। বরফের স্ফটিক সূর্যের আলোকে বাঁকিয়ে দেয়, ফলে দেখতে মনে হয় যেন আকাশে আরেকটি সূর্য রয়েছে। এটি অনেকটা সূর্য বা চাঁদের চারপাশে কখনো কখনো যে আলোর বলয় দেখা যায়, তার মতোই একটি প্রাকৃতিক আলোকীয় প্রভাব।
২০২০ সালে এই বিরল প্রাকৃতিক ঘটনার কারণে চীনের মোহে অঞ্চলে একসঙ্গে ‘তিনটি সূর্য’ দেখা গিয়েছিল। এর আগেও চীনের উত্তরাঞ্চলীয় ইনার মঙ্গোলিয়ায় মানুষ আকাশে ‘পাঁচটি সূর্য’ দেখতে পেয়েছিল বলে জানা যায়।

সানডগ কীভাবে তৈরি হয়?
সানডগ তৈরি হতে আইস ক্রিস্টাল বা বরফের স্ফটিক প্রয়োজন। এই স্ফটিকগুলো খুব ছোট, চ্যাপ্টা এবং ষড়ভুজাকৃতির হয়। এগুলো সাধারণত সিরাস বা সিরোস্ট্র্যাটাস নামক উঁচু মেঘে ভেসে বেড়ায়, অথবা খুব ঠান্ডা জায়গায় কিংবা ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছিও তৈরি হতে পারে, যাকে ‘ডায়মন্ড ডাস্ট’ বলা হয়।
স্ফটিকগুলো নিচে নামার সময় সাধারণত সমতল অবস্থায় থাকে। সূর্যের আলো যখন এসব স্ফটিকের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তা একটি নির্দিষ্ট কোণে, প্রায় ২২ ডিগ্রি বেঁকে যায় বলে ব্রিটানিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণেই উজ্জ্বল আলোর স্পটগুলো সূর্যের সমান উচ্চতায় এবং সামান্য পাশে দেখা যায়। আলো যদি পুরো বৃত্ত তৈরি না করে নির্দিষ্ট অংশে জমা হয়, তখন সেটিই সানডগ হিসেবে দেখা দেয়।
সানডগে রং কেন দেখা যায়?
সানডগে হালকা রঙ দেখা যেতে পারে। সূর্যের সবচেয়ে কাছের অংশটি সাধারণত লালচে দেখায়, আর তার প্রান্তগুলো ধীরে ধীরে হলুদ, কমলা ও নীল রঙে মিলিয়ে যায়।
এর কারণ হলো, বিভিন্ন রঙের আলো বরফের স্ফটিকের ভেতর দিয়ে ভিন্ন ভিন্নভাবে বেঁকে যায়।
নাম সানডগ কেন?
মানি কন্ট্রোলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সানডগ’ নামটি এসেছে অনেক আহগে মানুষের কল্পনা থেকে। তারা মনে করতেন, এই উজ্জ্বল দাগগুলো দেখতে ‘সূর্যের পাশে পাশে হাঁটা কুকুরের মতো’। কিছু গল্পে আকাশে জিউস (প্রাচীন গ্রীক পুরাণের দেবতা) ও তার কুকুরদের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘পারহেলিয়ন’, যার অর্থ ‘সূর্যের সঙ্গে’।
কখন সানডগ দেখা যায়?
সূর্যের আলো থাকলেই পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় সানডগ দেখা যেতে পারে। তবে সূর্য যখন আকাশে নিচু অবস্থানে থাকে, বিশেষ করে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় এবং যখন আবহাওয়া ঠান্ডা থাকে, তখন এগুলো সবচেয়ে সহজে চোখে পড়ে। এ কারণেই সাখালিনের মতো উত্তরাঞ্চলীয় এলাকায় শীতের সকালে প্রায়ই সানডগ দেখা যায়।
অর্থাৎ, রাশিয়ার সাখালিনে মানুষ যে ‘দুটি সূর্য’ দেখেছে, তা আসলে সত্যিকারের সূর্য নয়, বরং আকাশে আলো ও বরফের স্ফটিকের তৈরি এক বিরল প্রাকৃতিক দৃশ্য।