সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানানো নাটকীয়তায়, শেষ মুহূর্তে থামানো গেল নিলাম। রক্ষা পেল প্রায় ২৫০০ বছরের প্রাচীন, ভগবান বুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত একগুচ্ছ অমূল্য রত্ন পিপরাওয়া রেলিক্স। সীমান্ত পেরিয়ে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা এই কূটনৈতিক, আইনি অভিযানের লক্ষ্য ছিল একটাই: ভারতের সভ্যতা ও আত্মিক উত্তরাধিকারের অঙ্গচ্ছেদ হতে না দেওয়া।
পিপরাওয়া উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুরের কাছে অবস্থিত। বৌদ্ধ ইতিহাসে যার গুরুত্ব অপরিসীম। এই রত্নগুলি শুধু গয়না নয়, বুদ্ধের অস্থিধাতু, রেলিক, রিলিকোয়ারি ও খোদাই করা পাথরের সঙ্গে যুক্ত এক অনন্য ঐতিহ্য। প্রথমবার ১২৭ বছর পরে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া এই রত্নগুলির একাংশ ভারতে থাকা বুদ্ধ-রেলিকের সঙ্গে পুনর্মিলিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় ‘দ্য লাইট অ্যান্ড দ্য লোটাস: রেলিক্স অফ দ্য অ্যাওয়েকেন্ড ওয়ান’ প্রদর্শনীর মাধ্যমে। ঘটনার সূত্রপাত একটি ‘রুটিন অ্যালার্ট’ দিয়ে। কিন্তু খুব দ্রুতই তা বদলে যায় আন্তর্জাতিক স্তরের এক টানটান অভিযানে। জানা যায়, লন্ডনে থাকা পিপরাওয়া বুদ্ধ-রত্ন নিলামে তুলতে চলেছে আন্তর্জাতিক নিলাম সংস্থা সোদেবি’স, হংকংয়ে। বেস প্রাইস প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ১৮৯৮ সালে প্রাচীন কাপিলাবস্তুর স্তূপে এই রত্নগুলি আবিষ্কার করেছিলেন ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ উইলিয়াম ক্ল্যাক্সটন পেপ্পে। ১২৭ বছর পর ২০২৫ সালে তাঁরই বংশধর সেই রত্ন নিলামে তোলার উদ্যোগ নেন। কিন্তু নিলামের ঘণ্টা বাজলে এই সভ্যতার স্মারক চিরতরে ছড়িয়ে পড়ত ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের হাতে। আরও ভয় ছিল, চিনের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা। তাই তড়িঘড়ি হস্তক্ষেপ করে ভারত।
আইনের সঙ্গে দর্শনের অস্ত্র
এই উদ্ধার অভিযানে শুধুমাত্র সাফল্যই নয়, বরং আলাদা করে দিয়েছে ভারতের যুক্তি। শুধু মালিকানা বা আইনি অধিকারের প্রশ্নে নয়, ভারত দাবি তোলে দর্শনের ভিত্তিতে। সরকারের বক্তব্য ছিল এই রত্ন ‘বস্তু’ নয়, জীবন্ত সভ্যতার বাহক। করুণা, অহিংসা, জ্ঞানধারার ধারাবাহিকতা- বৌদ্ধ দর্শনের এই মূল স্তম্ভগুলির সঙ্গে যুক্ত পবিত্র স্মারক কখনও বাণিজ্যের বিষয় হতে পারে না। এই ‘নৈতিক ও সাংস্কৃতিক’ যুক্তিই আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বাণিজ্যের জায়গায় বিবেককে সামনে এনে ভারত কার্যত নিলাম স্থগিত করতে সক্ষম হয়। এবং শেষ পর্যন্ত রত্নগুলি ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অমূল্য ঐতিহ্যের সাক্ষ্য
ন্যাশনাল মিউজিয়ামের বিশেষজ্ঞ সভিতা কুমারী বলেন, ‘এই রত্নগুলির বয়স প্রায় আড়াই হাজার বছর। প্রাথমিক বৌদ্ধ সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন এগুলি।’ তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন ন্যাশনাল মিউজিয়ামের ডেপুটি কিউরেটর আবিরা ভট্টাচার্যও। তাঁর মতে, ‘এগুলি শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, সভ্যতার স্মৃতি যা ভৌগোলিক সীমানা মানে না।’ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই রত্নগুলি বিশ্বব্যাপী আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, বিশেষ করে সংগ্রাহক, মিউজিয়াম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে। এগুলি একবার নিলাম হয়ে গেলে ভারতীয় সংস্কৃতিতে অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হতো।