একটি রাজনৈতিক দলকে খুশি করতে কাজ করছে নির্বাচন কমিশন। বিএলও-মৃত্যুর ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী সরব হওয়ার মধ্যেই বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরে এসআইআর নিয়ে ডেপুটেশন জমা দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। বিএলওদের সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি, দুই বছরের কাজ দুই মাসে করার চেষ্টা করছে কমিশন, সেই অভিযোগও এদিন করেছেন তৃণমূল নেতৃত্ব।
রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে। এই আবহে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় একাধিক সাধারণ মানুষের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসছে। শনিবার সকালেই সুইসাইড নোটে নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করে কৃষ্ণনগরে ‘আত্মঘাতী’ হয়েছেন এক বিএলও। এখনও অবধি এসআইআরের কাজের চাপে তিন বিএলও-র মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ। এই পরিস্থিতিতে এসআইআর স্থগিতের জন্য নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঠিক তার ২ দিনের মাথায় শনিবার সিইও দফতরে যায় তৃণমূলের প্রতিনিধি দল। সেই দলে ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, সাংসদ পার্থ ভৌমিক-সহ অন্যান্যরা। সিইও-র সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সামনে এসে ক্ষোভ উগরে দেন নেতারা। তৃণমূলের অভিযোগ, একটি রাজনৈতিক দলকে খুশি করতে কাজ করছে নির্বাচন কমিশন।
কী বলছে তৃণমূল?
মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস বলেন, ‘২ বছরের কাজ ২ মাসে করা হচ্ছে। একটি রাজনৈতিক দলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা কমিশন করছে বলে অভিযোগ। প্রত্যেক বুথে ১৫০ থেকে ২০০ জন ভোটারের নাম ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে। কমিশনের ওয়েবসাইট ভুলেভরা। কমিশনের গাফিলতিতে বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।’ একধাপ এগিয়ে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য দাবি করেন, ‘নির্বাচন কমিশনের তথ্যে কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিএলও-দের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। রাজ্যজুড়ে বিএলও অ্যাপে সমস্যা, তথ্যে ভুল, অ্যাপ ক্র্যাশ করছে, এগুলো মানা যায় না।’ তাঁর আশঙ্কা, প্রতি ৫ জনের মধ্যে অন্তত ৪ জন বিএলও-রই নির্বাচন কমিশনের শুনানিতে হাজির হওয়ার সম্ভাবনা। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না হওয়া পর্যন্ত ডেডলাইন স্থগিত রাখা হোক-এমন দাবি ফের করেছেন তাঁরা। তৃণমূল নেতৃত্বের আরও দাবি, যথাযথ প্রশিক্ষণ না দিয়েই এসআইআর চালু করা হয়েছে। ফলে বুথস্তরে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। সেই প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাই একের পর এক মৃত্যুর পথ খুলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ শাসক দলের।

সরব মুখ্যমন্ত্রী
এসআইআরের কাজ নিয়ে জটিলতা বাড়ছে দিনের পর দিন। আর এই পাহাড়প্রমাণ চাপের কাছে হার মেনে কোনও কোনও বিএলও নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার পথে হেঁটেছেন বলে খবর। রাজ্যে ধারাবাহিকভাবে এসব ঘটনার জেরে এবার নির্বাচন কমিশনকে কড়া ভাষায় তোপ দাগলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার রিঙ্কু তরফদার নামে এক বিএলও-র আত্মহত্যার ঘটনায় কাজের চাপের অভিযোগ উঠেছে। এমনকী, একটি সুইসাইড নোটও পাওয়া গিয়েছে। যেখানে তাঁর মৃত্যুর জন্য নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছেন ওই বিএলও। এরপরই কমিশনকে নিশানা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
শনিবার এক্স হ্যান্ডল পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘আরও এক বিএলও-র মৃত্যুতে গভীরভাবে মর্মাহত। কৃষ্ণনগরে ওই মহিলা পার্শ্বশিক্ষক এদিন আত্মহত্যা করেছেন। বাড়িতে আত্মহত্যার আগে কৃষ্ণনগরের চাপড়ার ২০১ নং বুথের বিএলও, রিঙ্কু তরফদার সুইসাইড নোটে জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছেন।’ এরপরই কমিশনকে নিশানা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, ‘আর কত প্রাণ ঝরবে? এই এসআইআর-র জন্য আর কতজনকে মরতে হবে? এই প্রক্রিয়ার জন্য আর কত মৃতদেহ আমাদের দেখতে হবে? এটা এখন সত্যিই উদ্বেগজনক!’ বলে রাখা ভালো, সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি জাতীয় নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দিয়ে এসআইআর স্থগিত করার আর্জি জানিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, অপরিকল্পিতভাবে এই প্রক্রিয়া রাজ্যের মানুষ এবং সরকারি আধিকারিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। দু-তিন বছরের কাজ ২-৩ মাসে শেষ করতে বলা হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তৃণমূলের সাফ বার্তা, এই পরিস্থিতি অবিলম্বে সংশোধন করা না হলে আরও কঠোর পদক্ষেপ হবে।