অযোধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘গেরুয়া পতাকা’ উত্তোলন নিয়ে পাকিস্তানের মন্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। বৃহস্পতিবার কঠোর ভাষায় পাকিস্তানকে জবাব দিয়েছে বিদেশমন্ত্রক। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, ভারতের ধর্মীয় ঐতিহ্য বা সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে মন্তব্য করার কোনও নৈতিক অধিকার পাকিস্তানের নেই। এবার পাকিস্তানের মন্তব্যের তীব্র নিন্দা করে বিজেপি জানিয়েছে, প্রতিবেশি দেশ ওসামা বিন লাদেনের মতো বিশ্ব শান্তির কথা প্রচার করছে।
মঙ্গলবার বেলা ১১টা বেজে ৪৮ মিনিট নাগাদ উত্তোলন হয় রাম মন্দিরের গেরুয়া ধ্বজা। এই পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠান ঘিরে অযোধ্যায় লাখো মানুষের ভিড় ছিল। শুধু জনসাধারণ নয়, আসেন ৭ হাজার বিশিষ্ট অতিথি। প্রধানমন্ত্রীর চোখেও এই অনুষ্ঠান সাধারণ নয়। এই পতাকাকে ‘ভারতের সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের’ প্রতীক বলেই উল্লেখ করেছেন তিনি। এরপরই পাকিস্তান এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ভারতকে কটাক্ষ করে। পাক বিদেশমন্ত্রক এই ঘটনাকে ‘ইসলামফোবিয়া’ এবং ‘ঐতিহ্যের অপবিত্রতা’ বলে আক্রমণ করে। এরপরেই ইসলামাবাদকে নিশানা করে বিজেপির মুখপাত্র শেহজাদ পুনাওয়ালা বলেন, ‘পাকিস্তানই শেষ সত্তা হওয়া উচিত যারা সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং মানবাধিকার নিয়ে কাউকে বক্তৃতা দেবে। তাদের নিজস্ব রেকর্ড দেখুন এবং তারা ২৬/১১-এর দিনে এটি করছে, যেদিন তারা সবচেয়ে জঘন্য জঙ্গি হামলা চালায় এবং বহু নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।’ পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ও পাক আইএসআই সেনাবাহিনীর দ্বারা নির্যাতিত হয়।’
বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ভারতে ইসলামফোবিয়া এবং হিন্দুত্ব নিয়ে পাকিস্তানের ক্ষোভ ‘বিরোধী দলের নেতারা, বিশেষ করে কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেসের দ্বারা যে বর্ণনা দেওয়া হচ্ছে তার সঙ্গে ভয়ঙ্করভাবে মিল রয়েছে।’ বিজেপি নেতা আরও বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের উপর ধর্মান্ধতা, নিপীড়ন এবং দুর্ব্যবহারের কলঙ্কিত রেকর্ড-সহ একটি দেশ হিসেবে, পাকিস্তানের অন্যদের নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার কোনও নৈতিক অবস্থান নেই। ভণ্ডামিপূর্ণ প্রশংসা করার পরিবর্তে, পাকিস্তানের নিজস্ব মানবাধিকারের ভয়াবহ রেকর্ডের দিকে মনোনিবেশ করলে আরও ভাল হবে।’

কী বলেছিল পাকিস্তান?
অযোধ্যার রাম মন্দিরে পতাকা উত্তোলনের ঘটনায় তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে পাকিস্তান। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রসঙ্গ টেনে ভারতের সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে সরব হয় ইসলামাবাদ। পাকিস্তান আরও বলেছে, ভারত দায়ী ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়েছে এবং ভেঙে দেওয়া মসজিদের জায়গায় একটি মন্দির তৈরি করা হয়েছে। পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রক এটিকে ভারত সরকারের সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাব হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং বলেছে, এটি ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর চাপের একটি বৃহত্তর ধরণ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের প্রভাবে মুসলিম সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে নির্মূল করার ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টার প্রতিফলন ঘটায়। পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, বেশ কয়েকটি মসজিদ বিরোধ এবং আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, যা মুসলিম ধর্মীয় স্থানগুলির ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভারতে ক্রমবর্ধমান ইসলামোফোবিয়া, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং আক্রমণের দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, যেখানেই ধর্মীয় ঐতিহ্য হুমকির সম্মুখীন হোক না কেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ‘তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ’ নেওয়া।
রাম মন্দির ও প্রধানমন্ত্রী
মঙ্গলবার অযোধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী রাম মন্দিরের চূড়ায় গেরুয়া পতাকা উত্তোলন করেন। এই উপলক্ষে অযোধ্যায় বিপুল ভক্ত সমাগম হয়েছিল। রাম মন্দির নির্মাণ ট্রাস্ট প্রায় সাত হাজার অতি থেকে আমন্ত্রণ জানায় ওই অনুষ্ঠানে। গোটা বিশ্বের হিন্দু সম্প্রদায় ওই অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেন। ওই অনুষ্ঠানের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদী রাজধর্মের উল্লেখ করে বলেন ভগবান রাম কোনও ভেদাভেদ করতেন না। সেই ভাবনা নিয়েই চলছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। প্রধানমন্ত্রীর দাবি তার সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বিশ্বাস করে। অযোধ্যায় নবনির্মিত রাম মন্দিরের উদ্বোধন হয় গত বছরের ২২ জানুয়ারি। তার আগে ২০১৯ এর ৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যার বিতর্কিত জমি শ্রীরামচন্দ্রের জন্মস্থান বলে রায় দিয়ে সেখানে রাম মন্দির নির্মাণের অনুমতি দেয়। ওই রায়ের ফলে অযোধ্যায় মন্দির মসজিদ নিয়ে ৫০০ বছরের আইনি বিবাদের পরিসমাপ্তি ঘটে। প্রধানমন্ত্রী সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন এখন অযোধ্যা আধুনিকতা এবং আধ্যাত্মিকতার এক মিলন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।