দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষের ঘটনায় রবিবার রাতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রবীন্দ্র সরোবর থানা এলাকার গোলপার্কের কাঁকুলিয়া রোড। গড়িয়াহাটের একদম কাছে এই জনবহুল এলাকায় ঠিক কী করে গুলি-বোমা চলল, তা ঠাওর করে উঠতে পারছেন না অনেকেই। একটু প্রশ্ন করলেই গড়গড়িয়ে ক্ষোভের কথা বলছেন স্থানীয়রা। উঠছে এলাকা দখল ও বস্তি দখল প্রসঙ্গ, বেআইনি নির্মাণ-সহ একাধিক বিষয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর নেপথ্যে রয়েছে সোনা পাপ্পু। কসবা, ঢাকুরিয়া আর রামলাল বাজার চত্বরে নাকি ত্রাস এখন সে-ই। এখন সকলের একটাই প্রশ্ন, কে এই সোনা পাপ্পু? কীভাবেই বা এত দাপট? কার মদতে এলাকাজুড়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সে? সবকিছুর মাঝে উঠে আসছে শাসক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ছবি।
সোনা পাপ্পু কে?
অভিযুক্ত সোনা পাপ্পুর আসল নাম বিশ্বজিত পোদ্দার। কসবার, তোপসিয়া এলাকার বাসিন্দা। এলাকার মানুষের কাছে পাপ্পু নামেই পরিচিত ছিলেন বিশ্বজিত। জানা গেছে, পরিবারের দীর্ঘদিনের সোনার ব্যবসা এবং দোকান রয়েছে। স্থানীয়দের কথায়, মাঝে মধ্যেই সেই দোকানেও দেখা যেত পাপ্পুকে। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে অপরাধের জগতে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার। শুধু তাই নয়, কসবা, তোপসিয়া এলাকায় ‘ত্রাস’ হয়ে ওঠে এই সোনা পাপ্পু। এরমধ্যেই ২০১৫ সালে বালিগঞ্জ রেল ইয়ার্ডে এলাকা দখলের নামে যে সংঘর্ষ হয়েছিল, তাতেই এই পাপ্পুর নাম সামনে আসে। শুধু তাই নয়, পরে ২০১৭ তে একটি খুনের মামলাতেও তাঁর নাম জড়ায়। একটি পৃথক এফআইআরে নাম ছিল তাঁর।
এখানেই শেষ নয়, ২০২১ প্রেসিডেন্সি জেলের বাইরে ২৫ জন সঙ্গীকে নিয়ে প্রতিপক্ষ মুন্না পাণ্ডের উপর হামলার চেষ্টার হয়। সেই ঘটনাতেও এই পাপ্পুর নাম সামনে সামনে আসে। তথ্য বলছে, একাধিক থানায় তোলাবাজি-সহ অন্তত ২০টি বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু তারপরেও বহাল তবিয়তে পাপ্পুকে ঘুরতে দেখা যায়। স্থানীয় মানুষজনের অভিযোগ, শাসকদলের একাধিক নেতার সঙ্গে সোনা পাপ্পুর ঘনিষ্ঠতার কারণেই পুলিশ কিছু বলে না। আর সেই সুযোগে কসবা, তিলজলা, তপসিয়া এলাকায় অবাধ সিন্ডিকেট রাজ কাঁকুলিয়া রোডের ঘটনায় অভিযুক্ত চালায় বলেও অভিযোগ। পুলিশের দাবি, সম্প্রতি প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টায় ছিল অভিযুক্ত ওই সোনা পাপ্পু। বিশেষ করে রবীন্দ্র সরোবর, লেক এলাকাতে তাঁর বিশেষ নজর ছিল বলেও দাবি। আর সেই কারণেই ঢাকুরিয়ার কাঁকুলিয়া রোডে এই হামলা? উঠছে প্রশ্ন।

দুই ওয়ার্ড নিয়ন্ত্রণ
স্থানীয়দের অভিযোগ, কলকাতা পুরসভার ৬৭ নম্বর ও ৯১ নম্বর ওয়ার্ডে শাসকদলের হয়ে যাবতীয় নিয়ন্ত্রণের কাজ করে সোনা পাপ্পু। এলাকায় তার প্রভাব এমনই যে, ৯১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় রবিবার রাতে ঘটনাস্থল কাঁকুলিয়া রোডে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বলে অভিযোগ। যদিও ঘটনাস্থল পড়ে ৯০ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে-যার কাউন্সিলর বৈশ্বানরের স্ত্রী চৈতালি চট্টোপাধ্যায়। বাসিন্দাদের অভিযোগ আরও গুরুতর, বিগত পুরভোট হোক বা অন্য কোনও নির্বাচন, বিরোধীদের ‘ঘরবন্দি’ করতে সোনা পাপ্পুই নাকি শাসকদলের পছন্দের হাতিয়ার। মাত্র মাসখানেক আগে, পুরসভার বিল্ডিং বিভাগে ৫০–৫৫টি বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ জমা পড়ে। প্রতিটি অভিযোগেই উঠে এসেছে সোনা পাপ্পুর নাম। স্থানীয়দের ক্ষোভ, বিল্ডিং বিভাগের ইঞ্জিনিয়াররাও নাকি তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন না। এর আগে ২০২২ সালে তার নাম কুখ্যাত দুষ্কৃতীদের তালিকায় জুড়ে জেলবন্দি করেছিল কলকাতা পুলিশ। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বেরিয়ে আসে এবং আবার শুরু হয় প্রভাব-প্রতিপত্তি।