সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো আমাদের দেখিয়েছে, কম খরচের একটি ড্রোন মিলিয়ন ডলার মূল্যের ট্যাংক বা বিলিয়ন ডলারের রাডার সিস্টেম ধ্বংস করতে পারে। বিশ্বব্যাপী সামরিক ড্রোনের বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কামিকাজে ড্রোন এই বাজারের দ্রুত বর্ধনশীল একটি খাত। কারণ এগুলো সাশ্রয়ী, নির্ভুল এবং শনাক্ত করা কঠিন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত, এই বিস্ফোরক ড্রোনগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশলকে নতুন রূপ দিয়েছে।
কামিকাজে ড্রোন কী?
“কামিকাজে” শব্দটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জাপান থেকে এসেছে। এর অর্থ “দিব্য বাতাস” (divine wind)। ঐতিহাসিকভাবে এটি সেই আত্মঘাতী পাইলটদের বোঝাত, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের বিমান শত্রুদের যুদ্ধজাহাজের ওপর আছড়ে দিতেন। বর্তমানে এই ধারণাটি মানুষের পরিবর্তে যন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কামিকাজে ড্রোন হলো এমন এক ধরনের মানববিহীন আকাশযান, যা একইসঙ্গে নজরদারি ও আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। এটি নির্দিষ্ট এলাকার ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভেসে থাকতে পারে; ক্যামেরা, জিপিএস, ইনফ্রারেড সেন্সর বা এআই-ভিত্তিক সিস্টেমের মাধ্যমে হুমকি শনাক্ত করতে পারে এবং এরপর লক্ষ্যবস্তুর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হয়।
একটি কামিকাজে ড্রোন (যাকে সুইসাইড ড্রোন, লয়টারিং মিউনিশন বা ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোনও বলা হয়) মূলত একটি নির্দেশিত উড়ন্ত বোমা। প্রচলিত ড্রোনের মতো মিশন শেষে এগুলো ঘাঁটিতে ফিরে আসে না; বরং লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করে আঘাতের সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হওয়ার জন্যই এগুলো তৈরি। সেই প্রক্রিয়ায় নিজেও ধ্বংস হয়ে যায়।
কামিকাজে ড্রোন কীভাবে কাজ করে?
লয়টারিং মিউনিশন একটি সুস্পষ্ট অপারেশনাল ধাপ অনুসরণ করে।
প্রথমে, এটিকে একটি টিউব লঞ্চার, যানবাহন-সংযুক্ত প্ল্যাটফর্ম, অথবা গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। কিছু উন্নত ভার্সন আবার বড় ড্রোন থেকেও ছোড়া যায়।
উৎক্ষেপণের পর ড্রোনটি “লয়টার” পর্যায়ে প্রবেশ করে। অর্থাৎ এটি নির্ধারিত এলাকার ওপর চক্কর দিতে থাকে এবং অপারেটরদের কাছে রিয়েল-টাইম ভিডিও পাঠায়। এর মাধ্যমে কমান্ডাররা আঘাত হানার আগে লক্ষ্যবস্তু নিশ্চিত করতে পারেন।

ছোট আকার এবং অনেক নিচ দিয়ে উড়েতে সক্ষম বলে এর রাডার সিগনেচারও কম। ফলে কামিকাজে ড্রোন অনেক সময় প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। এদের উড্ডয়নপথ থাকে অনিশ্চিত, পাশাপাশি ঝাঁক ঝাঁকে হামলা চালানোর সক্ষমতা প্রতিরোধ বা ভূপাতিত করাকে আরও কঠিন করে তোলে।
এটি একটি ডেল্টা-উইং এয়ারফ্রেম ব্যবহার করে, যার পেছনে পুশার প্রপেলার থাকে। এর ডানার বিস্তার প্রায় ২.৫ মিটার এবং ওজন আনুমানিক ২০০–২৫০ কেজি। এটি ঘণ্টায় ১৮৫–২০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। আনুমানিক পাল্লা ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত; যা এটিকে শত্রু সীমার গভীরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম করে তোলে। এটি ৪০ থেকে ৫০ কেজি উচ্চ-বিস্ফোরক ওয়ারহেড হন করতে পারে; যা অবকাঠামো, কমান্ড সেন্টার এবং জ্বালানি ডিপো ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের মতো বহুমুখী ড্রোন থেকে ভিন্ন। রিপারের মতো ড্রোন ক্ষেপণাস্ত্র বহন করে মিশন শেষ করে ঘাঁটিতে ফিরে আসে। কিন্তু একটি কামিকাজে ড্রোন একবারই ব্যবহারের জন্য তৈরি। এটি আক্রমণ চালানোর পর লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে নিজেও ধ্বংস হয়ে যায়।
ইরান ইয়েমেনে হুথি মিলিশিয়াদের বিপুল পরিমাণ ড্রোন এবং সেসব তৈরি ও উৎক্ষেপণের প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলেন, ইরান এই করেছে যাতে হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে পারে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের তেল পরিশোধনাগার ও খনি আব্কাইক এবং খুরাইসের উপর পরিচালিত হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল। সে ঘটনা বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারকে প্রভাবিত করেছিল।
২০২৫ সালের জুনেও মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র সংঘাতে ইরান ব্যাপক পরিমাণ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। এই তথ্যগুলো সাম্প্রতিক কিছু পরিস্থিতির পাশাপাশি ইরানের সামরিক-প্রযুক্তি ও সংঘর্ষে ড্রোন ব্যবহারের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট তুলে ধরে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসারাইলের সঙ্গে চলমান সংঘাতেও ইরানের অন্ততম অস্ত্র এই কামিকাজে ড্রোন। মার্কিন–ইসরাইলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান এবং সৌদি আরবে মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালাচ্ছে। কাতার, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতসহ আরব দেশগুলো ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।