আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে রাজ্য সরকারের তরফে বিশিষ্টজনেদের ‘বঙ্গবিভূষণ’ ও ‘বঙ্গভূষণ’ সম্মান প্রদান করা হয়েছে। আর এই সম্মান প্রদান ঘিরেই শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক বিতর্ক। শনিবার সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য মতুয়া সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব তথা বাগদার হেলেঞ্চা গ্রামের বাসিন্দা গোঁসাই মৃণালকান্তি বিশ্বাসের হাতে বঙ্গভূষণ তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপরই আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে শাসকদল তৃণমূল এবং বিরোধী বিজেপির মধ্যে শুরু হয়েছে তরজা।
মৃণালকান্তি বিশ্বাস কে?
একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে ৭২ বছর বয়সি মৃণালকান্তি বিশ্বাসের হাতে এই সম্মান তুলে দেওয়া হয়। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরে (পিএইচই) কর্মরত মৃণালবাবু ২০১৫ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তবে কর্মজীবনের পাশাপাশি ১৯৮৭ সাল থেকেই তিনি মতুয়া সমাজের সার্বিক অগ্রগতির লক্ষ্যে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। উত্তর ২৪ পরগনার বাগদার বৈকোলায় তিনি ‘হরি-গুরুচাঁদ ভক্ত সেবা সংঘ’ নামে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তাঁরই উদ্যোগে সেখানে একটি হরিচাঁদ মন্দির এবং একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপিত হয়েছে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে একটি স্কুল নির্মাণের পরিকল্পনাও গ্রহণ করেছেন এই বর্ষীয়ান সমাজসেবী। মূলত মানুষের বিপদে-আপদে পাশে থাকা এবং মতুয়াদের উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ রাজ্য সরকার তাঁকে এই সম্মান প্রদান করেছে।
বঙ্গভূষণ ও মৃণালকান্তি বিশ্বাস
রাজ্য সরকারের অন্যতম এই নাগরিক সম্মান পেয়ে স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত মৃণাল গোঁসাই। প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, সারা জীবন হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের আদর্শ মেনে মতুয়া সমাজের উন্নয়নের জন্য কাজ করে চলেছেন। কতটা সফল হয়েছেন তা জানেন না, তবে রাজ্য সরকারের এই স্বীকৃতিতে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। এই সম্মান আগামী দিনে তাঁকে সমাজসেবার কাজে আরও বেশি উৎসাহিত করবে৷ এই সম্মান গ্রহণের পর রবিবার সকালে মৃণালকান্তি বিশ্বাস বাগদার হেলেঞ্চা এলাকার নিজের বাড়িতে ফিরলে তাঁকে ঘিরে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। স্থানীয় মতুয়া ভক্তরা তাঁকে ঘিরে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন। ঐতিহ্যবাহী ডঙ্কা, কাঁসি বাজিয়ে এবং নিশান উড়িয়ে হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা ও বরণ করে নেওয়া হয়।

তৃণমূল-বিজেপি তরজা
মৃণালকান্তি বিশ্বাসকে সমাজসেবার স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মান দেওয়া হলেও, এর নেপথ্যে গভীর রাজনৈতিক অঙ্ক দেখছে বিরোধী শিবির। বিশেষ করে, বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে মতুয়া সম্প্রদায়ের একজন প্রভাবশালী নেতাকে এই সম্মান প্রদান নিছকই কাকতালীয় নয় বলে দাবি গেরুয়া শিবিরের। গাইঘাটার বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর এই প্রসঙ্গে শাসকদলকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। তাঁর কথায়, ‘রাজ্য সরকার বঙ্গভূষণ সম্মান দিয়েছে, এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু মতুয়া সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের যে মূল দাবি, সেই নাগরিকত্ব প্রদানকে শাসকদলের আগে সমর্থন করা উচিত। নাগরিকত্ব পেতে মতুয়াদের সহযোগিতা করলেই তাঁদের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন করা হবে।’
অন্যদিকে, বিজেপির এই আক্রমণের কড়া জবাব দিয়েছে তৃণমূলও। বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার তৃণমূল সভাপতি বিশ্বজিৎ দাস পাল্টা তোপ দেগে জানিয়েছেন, মতুয়া সম্প্রদায়কে নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি চিরকাল কেবল ভোটের রাজনীতিই করে এসেছে। তাঁর দাবি, মতুয়াদের প্রকৃত উন্নয়ন এবং সম্মান একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দিয়েছেন। অতীতে মতুয়া ধর্মমাতা বীণাপাণি দেবী বা বড়মাকেও রাজ্য সরকারের তরফে সম্মান জানানো হয়েছিল বলে স্মরণ করিয়ে দেন বিশ্বজিৎ দাস। একই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, মতুয়া সমাজের মানুষ খুব ভালো করেই জানেন যে কারা তাঁদের প্রকৃত হিতাকাঙ্ক্ষী এবং কারা কেবল ভোটের স্বার্থে তাঁদের ব্যবহার করতে চায়।