নজিরবিহীন! ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি বিলম্বের জেরে টাকার দরে পতনের সর্বকালীন রেকর্ড। আশঙ্কা মিলিয়ে ডলার প্রতি টাকার দাম ৯০-এর গণ্ডি পেরিয়ে গেল। মঙ্গলবার মার্কিন ডলারের সাপেক্ষে ৮৯.৯৬-এ নেমেছিল টাকা। বুধবার ডলার প্রতি ভারতীয় মুদ্রায় ৯০.০৫ টাকা দিয়ে শুরু হল দিন। সোমবার এই দাম ছিল ৮৯.৭৩ টাকা। ভারতীয় মুদ্রা টাকার দামের এই পতন যেন কিছুতেই কমছে না। একটানা নাগাড়ে এই পতন চিন্তা বাড়াচ্ছে অর্থনৈতিক মহলে।
বুধবার ৮৯.৯৬ টাকা দিয়ে শুরু হয় দিন। তার কিছুক্ষণ পরেই তা ৯০ এর ঘর টপকে ৯০.১৩২৫ এ নেমে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এর পিছনে রয়েছে নানা ফ্যাক্টর। যার মধ্যে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির থমকে থাকা এবং বৈদেশিক পুঁজি ক্রমাগত বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে থাকা টাকার এই অবনমনের জন্য বিশেষভাবে দায়ী। আর তৃতীয়ত, ফরেক্স মার্কেট নিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কোনও ব্যবস্থা না নেওয়া। বাজারের অংশগ্রহণকারীরা বলছেন যে ডলারের অস্থির প্রবাহ রুপির দুর্বলতাকে আরও তীব্র করছে। মেকলাই ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের ডেপুটি চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার রিতেশ বানসালি ব্লুমবার্গ নিউজকে বলেন, ‘টাকার মূল্য হ্রাস পাওয়ায়, আমদানিকারকদের কাছ থেকে ডলারের চাহিদা বেশি থাকায় রপ্তানিকারকরা আক্রমণাত্মকভাবে ডলার বিক্রি করছেন না।’ বার্কলেস-এর মতে, শুধুমাত্র ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির সমাপ্তি মুদ্রার জন্য অর্থপূর্ণ স্বল্পমেয়াদী অবকাশ প্রদানের সম্ভাবনা রয়েছে। এইচডিএফসি সিকিউরিটিজ জানিয়েছে যে, গুরুত্বপূর্ণ ৯০ স্তর এখন লঙ্ঘন করায়, আগামী দিনে রুপি আরও ৯০.৩০-এর দিকে নেমে যেতে পারে।
আরবিআই কী করতে পারে?
দুর্বল পোর্টফোলিও প্রবাহ, বৃহত্তর বাণিজ্য ঘাটতি এবং মার্কিন-ভারত বাণিজ্য চুক্তি ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে নিকট ভবিষ্যতে টাকার উপর চাপ অব্যাহত থাকবে। যদিও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক টাকার পতন কমাতে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করছে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বুধবারই বৈঠকে বসতে চলেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মানিটারি পলিসি কমিটি। আগামী ৫ ডিসেম্বরই নতুন সুদের হার ঘোষণা করার কথা। কোটাক সিকিউরিটিজ লিমিটেডের অনিন্দ্য ব্যানার্জি ব্লুমবার্গ নিউজকে বলেন, ‘যদি আরবিআই টাকার মান ৯০-এর উপরে বন্ধ হতে দেয়, তাহলে আমরা আরও কিছু দেখতে পাব এবং টাকার দাম ৯১-এর গণ্ডিতে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখতে পাব।’ আসলে আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই মার্কিন শেয়ার বাজার চাঙ্গা হতে শুরু করে। আর তারই প্রভাবে টাকার দাম পড়তে শুরু করে। ক্রমেই আরও নিম্নমুখী হয়েছে টাকা।

ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরে বিলম্ব টাকার দামের পতনের নেপথ্যে রয়েছে বলে মনে করা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এর ফলে বাণিজ্যিক গতিবিধি শ্লথ হয়েছে। উৎপাদন ক্ষেত্র ধাক্কা খেয়েছে, কমেছে রপ্তানি। এর উপর বিদেশি বিনিয়োগ হাতছাড়া হওয়াটা গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি লগ্নিকারীদের মধ্যে ভারতীয় শেয়ার বেচে দেওয়ার ধারা অব্যাহত থাকায় চাপ আরও বেড়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক এবং আরও ২৫ শতাংশ ছিল রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার কারণে ভারতের ওপর ‘শাস্তি’ হিসেবে চাপানো অতিরিক্ত শুল্ক। এই পরিস্থিতিতে ভারতের রফতানি বড়সড় ধাক্কা খায়। এখন নতুন চুক্তির মাধ্যমে এই চাপ কমানোর চেষ্টা করছে উভয় দেশ।