এসআইআর-এর নাম করে বাংলার একজন যোগ্য ভোটারের নামও বাদ গেলে তৃণমূল কংগ্রেস যে বরদাস্ত করবে না, তা আগেই জানিয়েছিলেন দলীয় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত সোমবারই এ ব্যাপারে দলের আন্দোলনকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপরেই এসআইআর প্রক্রিয়ায় বেনিয়ম, একের পর এক অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করল তৃণমূল কংগ্রেস। শুক্রবার দেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে বৈঠকে সরসরি পাঁচটি প্রশ্ন তুলে ধরল তৃণমূলের প্রতিনিধি দল।
শুক্রবার সকালে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দফতরে গিয়ে কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে সঙ্গে দেখা করেন তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাব্দী রায়, দোলা সেন, মহুয়া মৈত্র, প্রকাশ চিক বরাইক, সাজদা আহমেদ, মমতাবালা ঠাকুর, প্রতিমা মণ্ডল, সাকেত গোখলে। প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে চলে বৈঠক। বৈঠক শেষে তৃণমূলের প্রতিনিধি দলের দাবি, তাঁদের কোনও প্রশ্নেরই উপযুক্ত জবাব দিতে পারেনি কমিশন।
তৃণমূলের পাঁচ প্রশ্নবাণ
এদিন বৈঠক শেষে বাইরে এসে তৃণমূলের লোকসভার উপদলনেতা শতাব্দী রায় বলেন, যে পাঁচটি প্রশ্ন করা হয়েছিল সেগুলির মধ্যে প্রথম হল, এই এসআইআর প্রক্রিয়া কী অনুপ্রবেশকারীদের রুখতে? সেটাই যদি হয়, তাহলে আলাদা করে বাঙালিদের টার্গেট করা হচ্ছে কেন? দেশজুড়ে বাঙালিদের উপর আক্রমণ করা হচ্ছে কেন? মিজোরাম, ত্রিপুরার মতো রাজ্যে কেন এসআইআর হচ্ছে না? বলা হচ্ছে অবৈধ ভোটার বাছতে এসআইআর, তাহলে এই অবৈধ ভোটারদের দ্বারা নির্বাচিত নরেন্দ্র মোদী সরকারের বৈধতা কী? শতাব্দীদের আরও প্রশ্ন, ‘এসআইআর-এর ফলে এ পর্যন্ত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেই মৃত্যুর দায় কী কমিশন নেবে? তাঁদের পরিবারের জন্য কী ব্যবস্থা নিচ্ছে কমিশন? এতদিন এসআইআর নিয়ে তৃণমূল যা যা অভিযোগ করেছে, সেটার ভিত্তিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?’ অন্যদিকে ডেরেক ও ব্রায়েন জানান, ‘এসআইআর ইস্যুতে কমিশনের কাছে আমাদের পাঁচটি প্রশ্ন রেখেছিলাম। কমিশন তার সদুত্তর দিতে পারেনি। আমরা বলেছি, তাড়াহুড়ো করে এসআইআর করা যাবে না, এখনই এই প্রক্রিয়া স্থগিত করা হোক।’

তৃণমূলের বক্তব্য, এসআইআর হোক, কিন্তু যে প্রক্রিয়ার সঙ্গে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার জড়িয়ে রয়েছে, সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে এত তাড়াহুড়ো কেন করা হচ্ছে? দলের অপর সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্ররা জ্ঞানেশ কুমারকে বলেন, ‘এখনকার ভোটার লিস্ট যদি ভুয়ো হয়, তাহলে তো সবার আগে বর্তমান সরকার ফেলে দেওয়া উচিত, আমরা যাঁরা সাংসদ তাঁদেরও তো তাহলে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে আসা উচিত। নয় কী?’ কমিশনের কাছে তাঁরা এই অভিযোগও করেন যে নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি সংস্থা কেন নিজেদের মতো কাজ না করে বিজেপির কথা মতো চলছে? এ ব্যাপারে বৈঠকে একাধিক তথ্য তুলে ধরে কল্যাণ, মহুয়ারা বলেন, ‘বিজেপির নেতারা আগের দিন যে কথা বলছেন, পরের দিন সেই একই কথা বলতে দেখা যাচ্ছে কমিশনকে। এর দ্বারা কী প্রমাণিত হয়?’
বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক ও প্রকৃত ভোটার
সম্প্রতি বাংলায় কথা বললেই বাংলাদেশি তকমা দিয়ে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিন রাজ্যে অত্যাচার করার একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছিল। ওই ঘটনার সঙ্গে এসআইআর-এর যোগসূত্র নিয়েও নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চান তৃণমূলের প্রতিনিধিরা। ডেরেক ও ব্রায়েন বলেন, ‘যেভাবে এসআইআর-এর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা হচ্ছে, তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, পুরোটাই বিজেপির তৈরি রুপরেখা অনুযায়ী কমিশন চলছে। তাই আমরা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে এসেছি, আমাদের প্রশ্নের সদুত্তর না দেওয়া পর্যন্ত বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হোক।’ একই সঙ্গে তাঁরা এও জানান, একজন প্রকৃত ভোটারেরও নাম বাদ গেলে বৃহত্তর আন্দোলন সংগঠিত করা হবে।
এর আগে তৃণমূলের প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে কমিশনের তরফে জানানো হয়েছিল, চারজনের বেশি দেখা করতে পারবেন না। এরপরই কমিশনকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘নির্বাচন কমিশনার যদি সত্যিই স্বচ্ছ্ব হয়, তাহলে মাত্র ১০ জন সাংসদকে ভয় কীসের? খোলাখুলি বৈঠক করুন, আমাদের পাঁচটা প্রশ্ন রয়েছে। লাইভ টেলিকাস্টে এই সোজাসাপ্টা পাঁচ প্রশ্নের জবাব দিন।’ শেষমেশ তৃণমূলের দাবি মেনে ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দেখা করেছেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। তবে লাইভ টেলিকাস্ট হয়নি। এখন দেখার তৃণমূলের দাবি মেনে কমিশন আগের অবস্থান থেকে সরে আসে কিনা, তা নিয়ে কৌতূহল সব মহলে।