মেক্সিকোর কুখ্যাত মাদক সম্রাট ‘এল মেনচো’ নামে পরিচিত নেমেসিও ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস রবিবার ভোরে বিশেষ বাহিনীর অভিযানে ধরা পড়ে। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিনের তল্লাশি, বহুবারের ব্যর্থতা- সবকিছুর শেষে প্রেমিকার উপর নজরদারি থেকেই মিলেছে সাফল্য। মার্কিন কর্তৃপক্ষ তার গ্রেফতার বা ধরিয়ে দেওয়ার তথ্যের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।
এক সাংবাদিক বৈঠকে কর্মকর্তারা ওই অভিযানের প্রথম বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। এই অভিযানের ফলেই মেক্সিকোর সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠিত অপরাধচক্র ‘জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল (সিজেএনজি)’–এর শীর্ষ নেতা নিহত হয়। এই কার্টেলটি বর্তমানে দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী অপরাধী সংগঠন হিসেবে পরিচিত। রবিবার ৫৯ বছর বয়সি কার্টেল নেতাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করার সময় মেক্সিকান সামরিক বাহিনীর অভিযানে মারাত্মকভাবে আহত হয়। এই অভিযানটি ওয়াশিংটনের গোয়েন্দা সহায়তায় পরিচালিত হয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তার দক্ষিণের প্রতিবেশী দেশটির ওপর চাপ দিয়ে আসছিল, যাতে ফেন্টানিল, মেথঅ্যামফেটামিন ও কোকেইন পাচারকারী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রতিরক্ষা সচিব রিকার্ডো ত্রেভিয়া ত্রেখো জানান, গুয়াদালাহারা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে তাপালপা শহরের বাইরে একটি বনাঞ্চলে অবস্থিত কেবিনটি যখন সামরিক বাহিনী ঘিরে ফেলে, তখন এল মেনচোর দেহরক্ষীরা সেনাবাহিনীর উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে।
গুলিবর্ষণের মুখে একটি হেলিকপ্টার জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়-যা ২০১৫ সালে এল মেনচোকে ধরার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টার স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, যখন তার বন্দুকধারীরা রকেট-চালিত গ্রেনেড দিয়ে একটি হেলিকপ্টার নিচে নামায়। লড়াই চলাকালীন এল মেনচো কেবিন থেকে পালিয়ে পাশের জঙ্গলে চলে যায়, সেখানে সে আহত অবস্থায় ধরা পড়ে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য মেক্সিকো সিটিতে স্থানান্তরের সময় তার মৃত্যু হয়। বন্দুকযুদ্ধে এল মেনচো ছাড়াও তার সাতজন সহযোগী নিহত হয়েছে এবং দুজন সেনা সদস্য আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে রাইফেল এবং গ্রেনেড লঞ্চার উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রেমিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
মেক্সিকোর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল রিচার্দো ত্রেভিলা বলেছেন, এবার গোয়েন্দাদের প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে তন্তন্দকারীরা এবার এল মেনচোর বান্ধবীদের মধ্যে একজনের বিশ্বস্ত সহযোগীকে শনাক্ত করে এবং তার ওপর নজরদারি শুরু করেন। ওই সহযোগী মেক্সিকান সামরিক বাহিনীর পরিচিত ছিলেন। গত শুক্রবার ওই সহযোগী এল মেনচোর এক প্রেমিকাকে নিয়ে জালিস্কোর তাপালপায় তার কমপ্লেক্সে যান। ওই বান্ধবী এল মেনচোর সঙ্গে রাত কাটানোর পরদিন বেরিয়ে গেলে মেক্সিকোর বিশেষ বাহিনী তাদের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। তারা নিশ্চিত হয় যে, স্পেশাল সিকিউরিটি নিয়ে ওই এলাকায় রয়েছে এল মেনচো। এরপরেই মেক্সিকোর আর্মি, ন্যাশনাল গার্ডের বাহিনী মিলে অভিযান শুরু করে। এছাড়া জালিস্কোর সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে ছয়টি হেলিকপ্টার এবং অতিরিক্ত বিশেষ বাহিনী মোতায়েন ছিল।
অভিযানের সময় দুবার দু’জন বডিগার্ডকে সঙ্গে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এল মেনচো। শেষমেশ কুখ্যাত এই মাদ্রক সম্রাটকে ধরতে সফল হয় মেক্সিকান বাহিনী। তবে অভিযানের সময় গুরুতর আহত হয় এল মেনচো এবং রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, এল মেনচোর নেতৃত্বাধীন ‘জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল’ (সিজেজিএন) মেক্সিকোর অন্যতম ভয়ঙ্কর সংগঠন। এল মেনচোর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সিজেজিএন’র সদস্যরা বিভিন্ন শহরে তাণ্ডব শুরু করে। পেরেক ও কাঁটা ছিটিয়ে রাস্তা অবরোধ করে এল মেনচোর অনুসারীরা। সেই সঙ্গে বাস ও অন্যান্য গাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে তারা। অনেক শহরে ব্যাঙ্ক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও আগুন লাগানো হয়। সহিংসতা শুরুর পর থেকে জালিস্কো রাজ্যে মেক্সিকোর ন্যাশনাল গার্ডের অন্তত ২৫ জন সদস্য নিহত হয়েছেন।