ইরানকে বাস্তবতা মেনে পরাজয় স্বীকার করে চুক্তিতে যেতে আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নয়তো দেশটিতে আরও ভয়াবহ আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে হোয়াইট হাউস। ১৫ দফা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর এই হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।
তেহরান আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তেহরান বলছে, বিভিন্ন পক্ষের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধে সম্মত হতে হবে।
যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া শান্তি পরিকল্পনাকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। একইসঙ্গে পাল্টা পাঁচ দফা প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান। স্থানীয় সময় বুধবার (২৫ মার্চ) পাকিস্তানের মাধ্যমে পাওয়া মার্কিন শান্তি পরিকল্পনার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানায় ইরান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রেস টিভিকে বলেন, ‘চলমান যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে দেয়া মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে ইরান। ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান যখন সিদ্ধান্ত নেবে এবং তার নিজস্ব শর্ত পূরণ হবে, তখনই এই যুদ্ধ শেষ হবে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরান হামলা অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি ওই কর্মকর্তা ইরানের পাঁচ দফা শর্ত তুলে ধরেছেন। এতে রয়েছে ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যা বন্ধ, ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দেয়া, সংঘাতের অবসান এবং হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।

প্রেস টিভি জানিয়েছে, ওয়াশিংটন বিভিন্ন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে তেহরান এই প্রস্তাবগুলোকে ‘অতিরিক্ত’ বলে মনে করছে।
এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ইরান পরাজয় স্বীকার না করলে আরও ভয়াবহ হামলা চালানো হবে।’
লেভিট বলেন, ‘ইরান যদি বাস্তবতা মেনে নিতে ব্যর্থ হয়, যদি বুঝতে না পারে যে তারা সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছে এবং আগামীতেও হতে থাকবে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিশ্চিত করবেন যেন তাদের ওপর আগের চেয়েও আরও ভয়াবহ আঘাত হানা হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো ফাঁকা বুলি দেন না। ইরানের উচিত হবে না পুনরায় কোনো ভুল হিসাব করা।’
তবে মার্কিন প্রশাসনের আলোচনার দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কোনো ধরনের আলোচনা চলছে না।
আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বার্তা পাঠাচ্ছে, তবে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে না। কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে ধ্বংসযজ্ঞের দায়ভার গ্রহণ এবং পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করতে হবে বলেও জানিয়েছেন আরাঘচি।
এদিকে সংলাপের কথা বললেও ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। জবাবে তেল আবিব ও মধ্যপ্রাচ্যে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে আইআরজিসি।
ইসরাইলের সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত হানছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র। তেহরানের দাবি, ডিমোনা ও হাইফায় চালানো হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইসরাইলে হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহও। তাদের রকেট মেতুলা, দাফনা ও নাহারিয়া এলাকায় আঘাত হেনেছে।মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও প্রতিশোধমূলক হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংকে ইরানি ড্রোন হামলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল দাফরা বিমান ঘাঁটি এবং দুবাই বিমানবন্দরের আশেপাশেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে ইসরাইলি বাহিনী লেবাননে জোরালো হামলা অব্যাহত রেখেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপত্তা অঞ্চল সম্প্রসারণ করছে ইসরাইল।
এদিকে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ। বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব হামলা সফলভাবে প্রতিরোধ করেছে।
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এর মারাত্মক বৈশ্বিক প্রভাব পড়তে পারে, বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে।