সাগরে নেই ইলিশ! বাংলাদেশে শূন্য হাতে ফিরছে ট্রলার

Spread the love

দেখা মিলছে না ইলিশের। সেটাও আবার যখন বাংলাদেশে বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার উপকূলে ইলিশের ভরা মৌসুম চলছে। সাধারণত এই সময়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ উঠে জালে। গত বছরের এই সময় জেলেদের জালে যেসব ইলিশ ধরা পড়েছিল, তার আকার ছিল গড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম। ২ হাজার ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশও ধরা পড়েছিল তখন। কিন্তু এবার ছবিটা একেবারেই আলাদা। ইলিশ ধরতে সমুদ্রে পাড়ি দেওয়া ট্রলারগুলি অধিকাংশই ফিরছে শূন্য হাতে ফিরছে তীরে। কয়েকটি ট্রলার ইলিশ পেলেও আকারে ছোট। ওজন বড়জোর ৩০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম।

ট্রলার মালিক ও মৎস্যজীবীরা জানিয়েছেন, গত ১০ বছরে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি। দূষণ, বৃষ্টি কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন-সহ একাধিক কারণে এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে গবেষকদের অনুমান, তবে এ নিয়ে বিশদ গবেষণা এখনও হয়নি। কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মাছ ধরার ছোট-বড় ট্রলার আছে প্রায় ছয় হাজার। এসব ট্রলারে কর্মরত মৎস্যজীবী ও শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার। ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ছয় থেকে সাত মাস ধরে নানা কারণে মৎস্যজীবীরা সাগরে গিয়েও ইলিশের দেখা পাননি। প্রতি মাসে কয়েকবার করে লঘুচাপ-নিম্নচাপ লেগে ছিল। লোকসান গুনতে গুনতে দেউলিয়া শত শত ট্রলার মালিক। মৎস্যজীবী পরিবারগুলো অর্থ সংকটে পড়েছে। এখন কিছু ট্রলারের জালে ছোট ইলিশ ধরা পড়ছে, তাও পরিমাণে কম। যে কারণে প্রতিটি ট্রলারের লোকসান হচ্ছে। এমন অবস্থা আর কত দিন চলবে, এর সঠিক উত্তর কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ মৎস্য বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুসারে, এখন জেলার টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজার সদর, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া ও চকরিয়ার অন্তত ৫০টি পয়েন্টে ছোট আকৃতির ৮ থেকে ১০ মেট্রিক টন করে ইলিশ ধরা পড়ছে, যা অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ছিল দৈনিক গড়ে ২০ মেট্রিক টন। অন্যদিকে, গত অর্থবছরে কক্সবাজার জেলায় ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৪০ হাজার ৪৪৮ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবর্ষে ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ হাজার টন। সাগরে ছোট ইলিশ ধরা পড়ার কারণ কী, তা জানতে চাইলে কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশরাফুল হক বলেন, শুধু কক্সবাজার নয়, দেশের সব উপকূলীয় জেলায় কিছুদিন ধরে ছোট আকৃতির ইলিশ ধরা পড়ছে, যা অতীতে দেখা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমনটা হচ্ছে কিনা, তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। এ নিয়ে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা।

ছোট ইলিশের চাহিদা

মঙ্গলবার সকালে শহরের নুনিয়াছটা ফিশারি ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, গভীর সাগর থেকে মাছ ধরে ঘাটে ফিরেছে ১৫ থেকে ২০টি ট্রলার। এরমধ্যে ৭টি ট্রলারের জালে ধরা পড়েছে ২০০ থেকে ৭০০টি ইলিশ। তবে প্রতিটি ট্রলারে অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ রূপচাঁদা, পোপা, লইট্যা, মাইট্যা, সুরমা ও কামিলা দেখা গেছে, তবে মানুষের নজর ইলিশের দিকে। ইলিশ কেনার জন্য কয়েকজন ব্যবসায়ী ট্রলারে ভিড় জমান। এফবি কাউসার নামের একটি ট্রলারে জালে ধরা পড়েছে ৬০০টি ইলিশ। ওজন ৩৫০ থেকে ৪০০ গ্রাম। ট্রলারের মৎস্যজীবীরা ইলিশগুলো বিক্রি করে পেয়েছেন ২ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা। মৎস্যজীবী আবুল কালাম (৫০) বলেন, ইলিশ ধরতে ট্রলার নিয়ে তাঁরা ১৯ মৎস্যজীবীরা ৭ দিন আগে সাগরে নেমেছিলেন। ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে সাগরে গিয়ে ৫ দিন জাল ফেলেন। কিন্তু ইলিশ ধরা পড়েছে ৬০০টি, তাও অনেক ছোট। সাগরের অন্তত ১০০ কিলোমিটার এলাকায় কয়েক দফায় জাল ফেলেও তাঁরা ইলিশের নাগাল পাননি।

মৎস্যজীবীরা জানান, গত বছর এই সময়ে একই দূরত্বের সাগরে জাল ফেলে ট্রলারটি ২০ হাজারের বেশি ইলিশ ধরেছিলেন। ওজন ছিল ৮০০ গ্রামের ওপরে। এখন কেন ইলিশের আকার ছোট হচ্ছে, তার কারণ তাঁরা খুঁজে পাচ্ছেন না। দেখা গেছে, ফিশারি ঘাটে বিক্রির জন্য আনা হয় কয়েক হাজার ইলিশ। ইলিশগুলো মাটিতে বিছিয়ে রাখা হয়। ব্যবসায়ীরা ইলিশের দরদাম করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ৯০ শতাংশ ইলিশের ওজন ৩৫০ থেকে ৪৫০ গ্রাম। পাইকারিতে এই ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। শহরের বাহারছড়া বাজার, কানাইয়ার বাজার ও বড় বাজারে এসব ইলিশ খুচরায় কেজিতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

ইলিশের আকার ছোট কেন?

ফিশারি ঘাটের কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ও পাইকারি মৎস্য বাজারের ব্যবস্থাপক আশীষ কুমার বৈদ্য বলেন, কয়েকদিন ধরে এই কেন্দ্রে দৈনিক তিন মেট্রিক টন করে ইলিশের বিক্রি হচ্ছে। তবে বিক্রি হওয়া ইলিশের আকার (ওজন) অনেক ছোট, অধিকাংশের ওজন ৩৫০ থেকে ৪০০ গ্রাম। ভরা মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে কেন ইলিশ ধরা পড়ছে না এবং ইলিশের আকার কেন এত ছোট, তা নিয়ে গবেষণা দরকার। তবে মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত দুটি কারণে ইলিশের আকার কমছে। প্রথমত, নদী ও সাগরের দূষণ এবং অক্সিজেনের অভাব। দ্বিতীয়ত, বৃষ্টি কম হওয়া। মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ডিসেম্বরের প্রথম ৯ দিনে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৯৪.১১ মেট্রিক টন। অক্টোবরে ইলিশ বিক্রি হয়েছিল ২১০ মেট্রিক টন। গত বছর অক্টোবরে ইলিশ বিক্রি হয়েছিল ৩০৫ মেট্রিক টন। এ হিসাবে গত বছরের তুলনায় এ বছরের অক্টোবরে ইলিশ বিক্রি কমেছে ৯৫ মেট্রিক টন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হতেই গত ২৫ অক্টোবর থেকে ইলিশ ধরতে সাগরে নামেন মৎস্যজীবীরা। প্রথম দিকে কমবেশি ট্রলারের জালে ইলিশ ধরা পড়লেও এখন কয়েক দিন ধরে অল্প পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়ছে, তাও আকারে ছোট। দূষণ, বৃষ্টি না হওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমনটা হচ্ছে বলে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। এ নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *