অফিসে কাজের চাপ, স্ট্রেস- সেই বিষয়গুলো এখনকার দিনে যেন একেবারেই ‘কমন’ হয়ে উঠেছে। সেই মানসিক চাপের পরিণতি যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সেটার প্রমাণ একাধিকবার মিলেছে। কিন্তু তারপরও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি বলে মাঝেমধ্যেই আক্ষেপ করেন মনোবিদরা। আর তারইমধ্যে দিনকয়েক আগে বিশ্বের প্রথমসারির একটি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কলকাতা শাখার উচ্চপদস্থ এক কর্তার মৃত্যুর ঘটনার পরে কর্মক্ষেত্রে প্রবল চাপ এবং স্ট্রেসের বিষয়টা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, অফিসের স্ট্রেস একটা ভয়ংকর স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের সেই স্ট্রেস কীভাবে কাটাবেন, কী করতে হবে, তা নিয়ে ‘হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা’-য় আলোচনা করলেন মনোবিদ অরুন্ধতী দাস। কীভাবে স্ট্রেস কাটিয়ে উঠতে পারবেন, কীভাবে জীবনটা রঙিন হয়ে উঠবে, তা নিয়ে একাধিক টিপসও দিলেন।
সেই রেশ ধরে যে কোনও ‘ট্রিটমেন্ট’ শুরুর আগে যেমনভাবে স্বীকার করে নিতে হয় যে কিছু একটা সমস্যা আছে, সেটার উপরেই জোর দিয়েছেন অরুন্ধতী। অর্থাৎ চাকরি করলে বা কাজ করলে যে চাপ থাকবেই, সেটা কোনওভাবে এড়িয়ে যাওয়ার বা লুকোছাপা করার কোনও ব্যাপার নেই। আর সেটা মাথায় রেখেই নিজেকে প্রস্তুত হতে হবে বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন মনোবিদ।
অফিসের জীবন সব নয়, জোর দিন পার্সোনাল লাইফেও
তাঁর কথায়, ‘কর্মক্ষেত্রের চাপটা অবশ্যম্ভাবী। সেটা আসবেই। কিন্তু অফিসের জীবনকেই যদি আমি সব ধরে নিই, যদি মনে করি যে আমার ব্যক্তিগত জীবনের কোনও মূল্য নেই, তাহলে আমাদের মাথায় স্ট্রেস চেপে বসতে বাধ্য। আমাদের ব্যালেন্সটা শিখতে হবে, যাতে প্রফেশনাল লাইফ এবং পার্সোনাল লাইফের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়। পেশাদার জীবনে যদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তাহলে ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব পড়বেই। সেটার জন্য আমাদের নিজেদের ছোট-ছোট উদ্যোগ নিতে হবে।’
তিনি জানিয়েছেন, এখন সব অফিসেই মনোবিদ থাকা উচিত। অফিসের বাইরেও অনেকের মনোবিদের সাহায্য নিতে পারেন। কিন্তু সারাজীবন মনোবিদের উপরে নির্ভর করে কাটিয়ে ফেলব, সেটাও ঠিক নয়। সেই পরিস্থিতিতে কিছুটা নিজেকেও উদ্যোগ নিতে হবে। কখনও হয়তো মারাত্মক স্ট্রেসের মধ্যে পড়ে গিয়েছেন, তাহলে কয়েকটা এক্সারসাইজ রয়েছে। সেগুলি করলে তাৎক্ষণিকভাবে স্ট্রেস কিছুটা কমে।
কোন কোন এক্সারসাইজের পরামর্শ দিয়েছেন?
১) কানের মধ্যে আঙুল রেখে ক্লক-ওয়াইজ ঘোরাতে পারেন। ৩০-৪০ সেকেন্ড করতে হয়। তাহলে স্নায়ুতন্ত্র সচল হয়। কমে উদ্বেগ।
২) চোখের সঞ্চালন বা আই মুভমেন্ট। একবার ডানদিকে করতে হয়। একবার বাঁ-দিকে করতে হয় চোখ।
৩) ডিপ ব্রিথিং টেকনিক আছে। অল্প শ্বাস নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রাখা। সাত-আট সেকেন্ড পরে নিশ্বাস ছাড়া। তাতেও উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা কিছুটা কমে যায়।
দিনে কিছুটা অত্যন্ত হাঁটাহাঁটি করতে হবে
তাছাড়াও হাঁটাহাঁটির উপরে জোর দিয়েছেন মনোবিদ। অরুন্ধতী জানিয়েছেন, অনেকেই সারাদিন বসে-বসে কাজ করেন। তাঁদের কিছুটা হলেও এক্সারসাইজ করতে হবে। আর সবথেকে ভালো এক্সারসাইজ হল হাঁটাচলা করা। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে কমপক্ষে ১০-১৫ মিনিট হাঁটলে ভালো হয়। যেদিন যেদিন সুযোগ থাকছে না, সেদিন অফিসে পৌঁছে লিফটে না করে গিয়ে হেঁটে উঠতে পারেন। এবার ১৬ তলায় অফিস হলে পুরোটাই উঠতে হবে না। পাঁচতলা পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে বাকিটা লিফটে করে যেতে পারেন।
‘ব্রেক হলেই সিগারেট খেতে গেলাম, তাতে স্ট্রেস বাড়বে’
সর্বোপরি নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অরুন্ধতী। তিনি জানিয়েছেন, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে হবে। লাঞ্চ টাইমে ঠিক করে খাবার খেতে হবে সকলকেই। যদি একান্ত সময় না থাকে, তাহলে নিদেনপক্ষে কিছুটা খেয়ে নিতে হবে। কোনও ব্রেক হলেই সিগারেট খেতে চলে গেলাম – সেটা করলেই স্ট্রেস বাড়বে। সেইসব স্বভাব ছেড়ে ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়ার উপরে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
‘বার্ন-আউট হয়ে গেলে নিজেরই কাজের ক্ষতি হবে’
সেইসঙ্গে যাঁরা প্রবল চাপে আছেন, তাঁদের মানসিকভাবেও চাঙ্গা হতে হবে। অরুন্ধতীর কথায়, ‘একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, আপনার মৃত্যু হলে অফিস একজন রিপ্লেসমেন্ট পেয়ে যাবে। কিন্তু আপনার পরিবার বা প্রিয়জনরা রিপ্লেসমেন্ট পাবে না। যা যাওয়ার, পরিবারেরই যাবে। তাই বার্ন-আউট যাতে না হন, সেই চেষ্টা করতে হবে। নিজের কথা ভাবতে হবে। পরিবারের কথা ভাবতে হবে। একটা জিনিস বুঝতে হবে, আমি যত বেশি স্ট্রেস মুক্ত থাকব, তত ভালো কাজ করতে পারব। যত স্ট্রেস বাড়বে, তত নিজের কাঙ্খিত ফলটা পাব না। ভালো হবে না কাজটা। এই জিনিসটা বুঝতে হবে।’
‘শরীরের হাত ভাঙলে তো ডাক্তারের কাছে যান….’
তাঁর মতে, ‘কর্মক্ষেত্রে যদি স্ট্রেস হয়, তাহলে অবশ্যই অফিসে জানানো উচিত। তাছাড়াও নিজের মনের কথাগুলো নিজের বন্ধু, পরিবার বা স্বামী-স্ত্রী’র সঙ্গে শেয়ার করতে হবে। মনের মধ্যে একা গুমরে থাকবেন না। প্রয়োজনে মনোবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। শরীরের হাড় ভেঙে গেলে তো ডাক্তারের কাছে যান। মন ভেঙে গেলে তাহলে কেন মনোবিদের কাছে যাবেন না? এখনও সমাজে ট্যাবু আছে। কিন্তু সেই ট্যাবুর জন্য তো নিজেকে আটকে রাখবেন না।’
আর সেইসঙ্গে প্রত্যেককে বুঝতে হবে, তিনি যে জীবনটা পেয়েছেন, সেটা অনেকেই পান না বলে জানিয়েছেন মনোবিদ। তাঁর মতে, জীবনটা যে কতটা দামি, সেটা নিজেকে বোঝাতে হবে। সেই কাজটা রোজ করতে হবে প্রত্যেককে। তাঁর কাছে যাঁরা পরামর্শের জন্য আসেন, তাঁদের সেই কাজটা আবশ্যিকভাবে করতে বলেন বলেও জানিয়েছেন অরুন্ধতী।
জীবনের প্রতি কেন কৃতজ্ঞ? রোজ ডায়েরি লেখার পরামর্শ
তিনি বলেছেন, ‘দিনের যে কোনও সময় বা রাতে ঘুমোতে যাওয়ার সময় নিজের জন্য ৫-১০ মিনিট বের করে লিখে রাখুন যে আজ সারাদিন কী কী পেলাম বা আমার পরিকল্পনা কী। আমার জীবনে কী কী আছে, সেটা লিখে রাখুন। জীবনে যে ইতিবাচক দিকগুলি আছে, সেগুলি রাখুন। নিজের জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো।’
সেইসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে বলি যে একটা ডায়েরি রাখুন। দিনের শেষে তাতে লিখে রাখুন যে কোন তিনটি জিনিসের জন্য আজ আপনি কৃতজ্ঞ। কেউ লিখতে পারেন যে আমার একটা চাকরি আছে। কেউ আবার লিখতে পারেন, আমার মাথার উপরে ছাদ আছে, আমার জল আছে, আমার খাবার আছে। এরকমভাবে লিখে রাখতে পারেন। সেটা সবার কাছে থাকে না কিন্তু।’