মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প(Donald Trump) ‘পারস্পরিক শুল্ক’ সংক্রান্ত ঘোষণা করতে চলেছে বুধবার। এই নিয়ে জল্পনার অন্ত নেই। এই আবহে ভারতও এই ঝড়ের জ্য প্রস্তুত হচ্ছে। ট্রাম্পের ‘পারস্পরিক শুল্ক’ ভারতের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা মূল্যায়ন করে প্রতিক্রিয়ামূলক পদক্ষেপ করতে পারে দিল্লি। বুধবার মার্কিন পূর্ব উপকূলীয় সময় বিকেল ৪টের সময় (ভারতে বৃহস্পতিবার) ‘পারস্পরিক শুল্ক’ নিয়ে ঘোষণা করতে পারেন ট্রাম্প। এদিকে হোয়াইট হাউজের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, ট্রাম্প এই ঘোষণা করতেই পারস্পরিক শুল্ক কার্যকর হয়ে যাবে।
ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, ‘পারস্পরিত শুল্ক’ সংক্রান্ত চারটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি এবং ভারতীয় বাণিজ্যের ওপর সেগুলির সম্ভাব্য প্রভাবগুলি ম্যাপ করেছে সরকার। মার্কিন শুল্ক নীতি পণ্য-নির্দিষ্ট হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে চিন, মেক্সিকো, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রফতানি। সেই পরিস্থিতিতে ভারতীয় রফতানি প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে। এদিকে আমেরিকা যদি সেক্টর-ভিত্তিক শুল্ক পদক্ষেপ করে, তাহলে ব্যয় বৃদ্ধি এবং মার্জিন হ্রাস করতে হতে পারে বিভিন্ন পণ্যের। সেই ক্ষেত্রে বিশ্বের সব দেশই প্রভাবিত হবে। অপরদিকে দেশ-নির্দিষ্ট এবং সেকেন্ডারি শুল্ক পরিস্থিতিতে ভারতের অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এই বিষয়ে সরকারি এক আধিকারিক হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, ‘এই অনিশ্চয়তার পরিবেশে আমেরিকানরাও অনুমান করছে। আর আমরা ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছি। এরপর আমাদের বাণিজ্যের ওপর এর কী প্রভাব পড়ে, সেটার মূল্যায়ন করব।’
এর আগে গতকাল ফের একবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ভারত খুব শীঘ্রই আমেরিকার পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক কমাবে। এর আগেও এই ধরনের দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। তবে সেই সময় ভারত সরকারের তরফ থেকে সংসদে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, দিল্লির তরফ থেকে ওয়াশিংটনকে এই নিয়ে কোনও কথা দেওয়া হয়নি। এদিকে ২ এপ্রিল থেকেই আমেরিকা পারস্পরিক শুল্ক চাপাতে শুরু করবে। এই আবহে দিনটিকে ‘মুক্তি দিবস’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন ট্রাম্প। এই আবহে ৩১ মার্চ হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি শুনেছি ভারত তাদের শুল্ক অনেকটা কমাতে চলেছে। অনেক দেশই তাদের শুল্ক কমাতে চলেছে।’
এদিকে ভারত এই পরিস্থিতি সম্পর্কে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। কারণ কেবলমাত্র শুল্ক নয়, সহযোগিতার ভিত্তিতে বাণিজ্য চুক্তির মূল্যায়ন করে দিল্লি। এই বিষয়ে এক উচ্চপদস্থ আধিকারিক বলেন, ‘যে কোনও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির প্রভাব কেবলমাত্র শুল্কের হার দ্বারা পরিমাপ করা হয় না। পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বারা তা পরিমাপ করা হয়।’ সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) উদাহরণ দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ভারত এলএনজির আমদানি শুল্ক শূন্যে নামিয়ে এনেছে কারণ দেশের জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা আছে এবং এই পণ্যের কোনও অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা নেই। এদিকে ভারতের এই সংযত প্রতিক্রিয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের অগ্রগতি হচ্ছে। এই বিষয়ে সেই সরকারি আধিকারিক বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত কোনও নেতিবাচক কিছু ঘটেনি। বস্তুত, নয়াদিল্লিতে প্রস্তাবিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চার দিনের আলোচনা ইতিবাচকই হয়েছে।’
এর আগে লাগাতার ভারতীয় শুল্ক নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে গিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের মার্কিন সফরের সময়ই তিনি এই সব মন্তব্য করেছিলেন। ‘ভিনদেশ’ থেকে আসা কৃষিপণ্যকে ‘নোংরা’ আখ্যা দিয়ে আক্রমণ শানিয়েছিলেন ট্রাম্প। রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে যে কৃষি ক্ষেত্রে আমেরিকাকে যাতে ভারত তাদের বাজারে প্রবেশাধিকার দেয় এবং শুল্ক কমায়। উল্লেখ্য, ২ এপ্রিল থেকে বেশ কয়েকটি দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ভারতও রয়েছে। ট্রাম্প বারবার ভারতের বাণিজ্য নীতির সমালোচনা করে এসেছেন। তিনি বিগত দিনে ভারতকে ‘শুল্কের রাজা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ট্রাম্পের কথায়, ‘ভারতের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু আমার একমাত্র সমস্যা হলো তারা বিশ্বের সর্বোচ্চ শুল্ক আরোপ করা দেশগুলির একটি। আমি মনে করি তারা সম্ভবত এই শুল্ক কমাবে। তবে ২ এপ্রিল থেকে আমরাও তাদের ওপর সেই শুল্ক চার্জ করব, যা তারা আমাদের পণ্যে বসাবে।’
এদিকে সম্প্রতি মার্কিন বোরবন হুইস্কির ওপর শুল্ক কমিয়েছে ভারত। এর আগে মার্কিন বোরবন হুইস্কির ওপর ১৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করছিল ভারত। তা এবার ৫০ শতাংশ কমিয়ে ১০০ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে জনপ্রিয় মার্কিন ব্র্যান্ড জিম বিমের দাম কমতে পারে ভারতে। এদিকে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি এই শুল্ক কমানোর নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। এর আগে এবারের বাজেটে মোটরসাইকেলের ওপরে শুল্ক কমায় ভারত। এর ফলে মার্কিন ব্র্যান্ড হারলে ডেভিডডসনের আমদানির ক্ষেত্রে ভারতে আরও ১০ শতাংশ শুল্ক কমেছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত হারলে ডেভিডসনের ওপরে ৫০ শতাংশ শুল্ক কমিয়েছিল। আর এবারের বাজেটে তা আরও কিছুটা কমানো হয়।