প্রযুক্তি বা ব্যবসায়িক কৌশলের অজুহাতে নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে কোনও রকম আপস করা চলবে না। মঙ্গলবার এক মামলার শুনানিতে হোয়াটসঅ্যাপ এবং তার মূল সংস্থা মেটা-কে কড়া ভাষায় সতর্ক করল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, ডেটা শেয়ারিংয়ের নামে ব্যক্তিগত তথ্যের উপর কোনও রকম হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।
সংবাদসংস্থা পিটিআই সূত্রের খবর, শুনানির সময় শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, ‘ডেটা শেয়ারিংয়ের নামে এই দেশের নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকার নিয়ে খেলতে পারেন না।’ আদালত মেটার সেই যুক্তিও খতিয়ে দেখে, যেখানে ব্যবহারকারীর সম্মতি এবং ‘অপ্ট-আউট’ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে বেঞ্চের কড়া পর্যবেক্ষণ, ‘অপ্ট-আউটের প্রশ্নই বা কোথায়’, এই ধরনের যুক্তি আসলে ‘ব্যক্তিগত তথ্য চুরিরই একটি মার্জিত উপায়।’ এই মামলার পরিধি আরও বাড়িয়ে সুপ্রিম কোর্ট ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রককে মামলার পক্ষভুক্ত করেছে। আদালত জানিয়েছে, আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। মূলত হোয়াটসঅ্যাপ ও মেটার দায়ের করা আবেদনগুলির শুনানি চলছিল। পিটিআই জানিয়েছে, এই আবেদনে প্রতিযোগিতা কমিশন অব ইন্ডিয়ার (সিসিআই) সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, যেখানে হোয়াটসঅ্যাপের ‘নিতে হবে, নইলে ছাড়ুন’ ধরনের গোপনীয়তা নীতির জন্য জরিমানা আরোপ করা হয়েছিল। কমিশনের মতে, এই নীতির মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের কার্যত কোনও বিকল্প না দিয়েই শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
‘চতুরভাবে সাজানো’
শুনানি চলাকালীন সুপ্রিম কোর্ট আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, বড় প্রযুক্তি সংস্থাগুলির গোপনীয়তা সংক্রান্ত নীতিগুলি এমনভাবে তৈরি করা হয়, যা সাধারণ নাগরিকের পক্ষে বোঝা অত্যন্ত কঠিন। ফলে ব্যবহারকারীর সম্মতি আদৌ কতটা অর্থবহ, সেই প্রশ্নও ওঠে। বেঞ্চের মন্তব্য, এত জটিল ও ‘চতুরভাবে সাজানো’ শর্তের মধ্যে প্রকৃত সম্মতির ধারণাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

‘টেক ইট অর লিভ ইট’
ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালে হোয়াটসঅ্যাপের সেই বিতর্কিত ‘টেক ইট অর লিভ ইট’ প্রাইভেসি পলিসি নিয়ে। সিসিআই অভিযোগ করেছিল, হোয়াটসঅ্যাপ তার আধিপত্য খাটিয়ে ব্যবহারকারীদের বাধ্য করছে মেটার অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করতে। এই কারণে হোয়াটসঅ্যাপ ও মেটা-কে ২১৩.১৪ কোটি টাকা জরিমানা করেছিল কম্পিটিশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া। এনসিএলএটি সেই জরিমানা বহাল রাখলে তার বিরুদ্ধেই সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে মেটা। জানা গিয়েছে, ২০২৫ সালে ন্যাশনাল কোম্পানি ল অ্যাপিলেট ট্রাইবুনালের ডেটা শেয়ারিং ও বাজারে আধিপত্য সংক্রান্ত নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে আবেদন করেছিল হোয়াটসঅ্যাপ এবং মেটা। সব মিলিয়ে, প্রযুক্তি সংস্থার ডেটা ব্যবহার ও নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার – এই দুইয়ের ভারসাম্য নিয়েই এখন আদালতের নজর। সুপ্রিম কোর্টের কড়া অবস্থান ভবিষ্যতে ডিজিটাল গোপনীয়তা সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার। মামলার পরবর্তী শুনানিতে কেন্দ্র এবং মেটা, উভয় পক্ষকেই তাদের বক্তব্য বিশদে জানাতে হবে। তথ্য সুরক্ষা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া অবস্থান ভবিষ্যতে টেক জায়ান্টদের একচেটিয়া আধিপত্যে লাগাম টানবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।