Durga Puja: তৃণমূল কংগ্রেসের এক সময়ের দাপুটে নেতাদের অনেকেই এখন কার্যত রাজনীতির মূল স্রোত থেকে দূরে। দুর্গাপুজোর আবহেও সেই বদলের ছবি স্পষ্ট। এক সময় পুজো মণ্ডপে তারকাদের ভিড়, উদ্বোধন আর জমজমাট উপস্থিতিতে নজর কাড়ত তৃণমূলের নেতৃত্ব। যা কিনা উৎসবের মরসুমে বাড়তি উত্তেজনা যোগ করত। কিন্তু এবার সেই পরিচিত ছবিতে অনেকটাই বদল এসেছে। পুজোর আয়োজনে নেই পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সুজিত বসু, ফিরহাদ হাকিমের মতো রাজ্যের দাপুটে নেতারা। তাঁদের মধ্যে কেউ জেল খাটছেন, ক্রাইসিসে কারও মনে পড়ছে মুকুল রায়কে, কেউ দলের সর্বোচ্চ পদ সামলেও এখন নিঃসঙ্গ। প্রাক্তন মন্ত্রী, জেল থেকে ফেরা পার্থ চট্টোপাধ্যায় থেকে বর্তমান সাংসদ সৌগত রায়, পালাবদলের পর প্রথম পুজো সকলেরই যেন অন্যরকম।
তৃণমূলের ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় থেকেই একসঙ্গে কালীঘাটের চার মাথা। যার মধ্যমণি ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাকিরা সুব্রত বক্সি, মুকুল রায়, পার্থ চট্টোপাধ্যায়। কালীঘাটের একচালা ঘরে রাখা মা তারার পা ছুঁয়ে চারজনেই শপথ নিয়েছিলেন, জীবনে যখনই যা-ই হয়ে যাক, কেউ কাউকে ছেড়ে যাবেন না। কিন্তু এখন সব শেষ। বিজেপি ক্ষমতা আসতেই ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে তৃণমূল। দুই শিবিরে বিভক্ত হয়েছে এই রাজনৈতিক দল। এই বিষয়ে রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মত, ‘এই দল আর উঠে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে হয় না।’ অথচ এক সময় মমতা শিবিরের অন্যতম হেভিওয়েট নেতা ছিলেন তিনি। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর স্বীকারোক্তি, ‘মমতা ভুল থেকে শিক্ষা নিল না। আগেও ভুল করেছে, যখনই যে ডুবেছে তার হাত ছেড়ে দিয়েছে। এখনও সেই শুধু নিজেরটুকু নিয়েই রয়েছে। এখনও যে ভুল করছে তার হাত ছেড়ে দিচ্ছে। এখনও ভুল করছে।’
দলের বর্তমান সংকট সামলানোর ক্ষেত্রে প্রয়াত মুকুল রায়ের অনুপস্থিতিও তাঁকে ভাবাচ্ছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের আক্ষেপ, ‘মুকুলকে খুব মিস করছি। ও থাকলে এবং সুস্থ থাকলে এই ক্রাইসিস হয়তো সামলে দিতে পারত। মমতার আশপাশে আগে যারা ছিল তারা যতটা পেরেছে ওকে ভুল বুঝিয়েছে, এখনও যারা রয়েছে তারাও ভুল বুঝিয়ে চলেছে।’ এ বছর কলকাতাজুড়ে দুর্গা পুজোর প্যান্ডেলগুলিতে বিজেপির দাপট। শহর সেজেছে কমলা বর্ণে। কোথাও নেই নীল-সাদার বিধুমাত্র ছোঁয়া। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে একটি পুজোও এবার উদ্বোধন করেননি, পাড়ার পুজো কালীঘাট মিলন সংঘের মণ্ডপে ঢুকে দুই খুদেকে দিয়ে ফিতে কাটিয়েছেন। তাঁর ভাইপো সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারে এখনও কোনও পুজো উদ্বোধনে যাওয়ার শিডিউল নেই। অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম জুটির জমজমাট দুর্গাপুজো আছে। তবে সে দুটি থেকে এই দুই তারকা নাম কার্যত উধাও। সুরুচি সংঘের সংসর্গ থেকে অরূপের নাম পুরোপুরি মুছে গিয়েছে। চেতলা অগ্রণীর পুজোর সঙ্গে নামমাত্র জড়িয়ে আছেন ফিরহাদ হাকিম। তেমন দাপট নেই তাঁর।

এছাড়া যে তারকারা একসময় দুর্গাপুজো আলো করে বসে থাকতেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম পার্থ চট্টোপাধ্যায়। নাকতলা উদয়ন সংঘের প্রাক্তন কর্তা। তাঁর গ্রেফতারি এবং জেলজীবনের পর সেই পুজো জৌলুস হারায়। এবার পুজোয় তিনি নিজের নাকতলার বাড়িতেই থাকছেন। পুরনো বন্ধুদের আসার কথা। পুজো কাটানো বলতে এটুকুই। এই মুহূর্তে কোনও পুজোর সঙ্গেও জড়িত নন তিনি, কোনও পুজো উদ্বোধনের আমন্ত্রণও নেই। অন্যদিকে, বিজেপির বিরুদ্ধে পুজো কমিটিগুলিতে কর্তৃত্ব ফলানোর অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়। দমদমে কিছু পুজো কমিটিতে আমন্ত্রণ পেয়েছেন বর্ষীয়ান সাংসদ। কলেজ স্কোয়ারের পুজো কমিটির তিনি সভাপতি। কিন্তু সেই পুজোয় তিনি থাকছেন না। তাঁর অভিযোগ, সে সবেও বিজেপি নাক গলিয়েছে। তাই বিরক্ত হয়ে তিনি দিল্লি পাড়ি দিয়েছেন। যোগ দেবেন সেখানকার করোলবাগের পুজো কমিটির আমন্ত্রণে। তাঁর কথায়, ‘কলেজ স্কোয়ারের পুজোর খুঁটিপুজো করলেন শমীক ভট্টাচার্য। বিজেপির বিধায়ক-নেতারা এখন সেখানে কর্তৃত্ব ফলাচ্ছেন। খামোখা এসবে থাকা মানে অপমানের মধ্যে পড়া। তার থেকে দিল্লি ভালো।’অসুস্থতার কারণে প্রাক্তন তৃণমূল রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সিও এবার পুজোর দিনগুলিতে বাড়ির কাছের পাড়ার পুজোয় সীমাবদ্ধ থাকছেন। খুব একটা বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন না, ফোনেও চট করে পাওয়া যায় না। তবে টুকটাক বাড়ি থেকে বেরিয়ে কখনও কাছের বকুলবাগান রোডের পার্টি অফিস, কখনও পাড়ার পুজো ‘ঐকতান’-এ এসে বসছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর ভাই সন্দীপ বক্সি। তাঁর কথায়, ‘কোনও পুজোয় যাওয়া তো দাদার পক্ষে আর সম্ভব না। তবে পাড়ায় মাঝেমাঝে এসে বসছেন, অল্প কথা বলছেন। কথাও দিয়েছেন পুজোর চারটে দিন পাড়ার পুজোয় থাকবেন।’ অন্যদিকে, তৃণমূলের প্রথম জয়ী বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় নিজের হাজরা পার্কের পুজোর পাশাপাশি কয়েকটি মণ্ডপ উদ্বোধন করেছেন। বালিগঞ্জের সঙ্গে পুরনো কেন্দ্র রাসবিহারী কেন্দ্রেরও বেশ কিছু পুজোয় গিয়েছেন। হাজরা পার্কের পুজোয় বরাবর অষ্টমীর সন্ধ্যারতি করেন। এবারও করবেন। তাঁর কথায়, ‘এবারের পুজো কিছুটা হালকা। তবে বেশ কিছু পুজোয় আমন্ত্রণ ছিল, সেসব মিটিয়ে নিয়েছি। পারলে পুজোয় এ পাড়া-সে পাড়ায় কিছুটা ঘুরব নিজের মতো।’ সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজোর আবহে তৃণমূলের পুরনো নেতাদের উপস্থিতি, দলীয় সংকট এবং রাজনৈতিক সমীকরণের বদল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।