Nana Patekar Obituary। গৎবাঁধা নায়কের ছক ভেঙে যিনি বদলে দিয়েছিলেন হিন্দি সিনেমা

Spread the love

তারকার অভাব নেই ভারতীয় সিনেমায়, সুপারস্টারদেরও আলাদা নাম-ডাক রয়েছে। কিন্তু তাঁদের ভিড়ে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের ‘তারকা’ তকমা স্পর্শ করতে পারে না— তাঁরা শুধুই একজন প্রকৃত ‘শিল্পী’। বিগত প্রায় ৫০ বছরের অভিনয় জীবনে নানা পাটেকর (Nana Patekar) কখনও তারকা হওয়ার দৌড়ে ছোটেননি। বরং নিখুঁত নায়কের ছক ভেঙে ৮০ ও ৯০-এর দশকে হিন্দি সিনেমার সমস্ত গতেবাঁধা নিয়মকে একাই তছনছ করে দিয়েছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার ৭৫ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। কিন্তু কীভাবে এক মারাঠি থিয়েটার কর্মী হয়ে উঠলেন বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী মুখ? ফিরে দেখা যাক তাঁর সেই ঐতিহাসিক সফর।

‘নায়ক’ না হয়েও শুরু থেকে নজরকাড়া

আত্মপ্রকাশ১৯৫১ সালে বিশ্বনাথ পাটেকর হিসেবে এক সাধারণ মারাঠি পরিবারে জন্ম নেওয়া নানার অভিনয় যাত্রা কোনো ঝাঁ-চকচকে প্রচার বা গ্র্যান্ড লঞ্চ দিয়ে শুরু হয়নি।

১৯৭৮ সালে মারাঠি ছবি ‘গমন’ (Mimagaman) দিয়ে তাঁর শান্ত আত্মপ্রকাশ। এরপর ব্রিটিশ টিভি সিরিজ ‘লর্ড মাউন্টব্যাটেন: দ্য লাস্ট ভাইসরয়’-এ নাথুরাম গডসের একটি ছোট ভূমিকায় অভিনয় এবং পরবর্তীতে ‘আজ কি আওয়াজ’ (১৯৮৪) ছবিতে কাজ করে নজরে আসেন তিনি। টার্নিং পয়েন্ট ‘অঙ্কুশ’ (১৯৮৬): এন চন্দ্র পরিচালিত ‘অঙ্কুশ’ ছবিতে চার বেকার তরুণের একজন হিসেবে নানার দ্রুত ডায়ালগ ডেলিভারি, চোখ দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ এবং শক্তিমান পারফর্ম্যান্স তাঁর ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে। এখান থেকেই তৈরি হয় তাঁর বিখ্যাত ‘নানা টেমপ্লেট’।

জাতীয় পুরস্কার থেকে পরিচালক নানা:

ছক ভাঙার গল্পনব্বইয়ের দশকে মিরা নায়ারের অস্কার-মনোনীত ছবি ‘সালাম বোম্বে’ এবং বিধু বিনোদ চোপড়ার ‘পরিন্দা’ (যার জন্য তিনি সেরা পার্শ্ব অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পান) নানাকে প্রভূত সম্মান এনে দেয়। কিন্তু শুধুই ‘পার্শ্ব অভিনেতা’ হিসেবে চিহ্নিত হতে রাজি ছিলেন না তিনি। পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ: ১৯৯১ সালে নানার নিজের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘প্রহার’। প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তার ভূমিকায় মাধুরী দীক্ষিতের বিপরীতে তাঁর এই ছবি পরবর্তীকালে কাল্ট ফেভারিটের তকমা পায়।

বক্স অফিস কাঁপানো ‘তিরঙ্গা’ ও ‘ক্রান্তিবীর’: রাজ কুমারের সাথে ‘তিরঙ্গা’ এবং ১৯৯৪ সালে ‘ক্রান্তিবীর’ ছবির হাত ধরে তিনি একাই বক্স অফিসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠেন। ‘ক্রান্তিবীর’-এ সেই বিখ্যাত বিপ্লবীর চরিত্রে তাঁর সংলাপ আজও ভাইরাল। এই ছবির জন্যই তিনি সেরা প্রধান অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন।

কমেডি থেকে বিতর্ক:

গম্ভীর চরিত্রেই নয়, কমেডিতেও নিজের অসামান্য টাইমিং প্রমাণ করেছেন নানা। উদয় শেট্টির আইকনিক চরিত্র: ২০০৭ সালে আনিস বাজমির ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে ‘উদয় শেট্টি’ চরিত্রটি হিন্দি সিনেমার পপ-কালচারে অমর হয়ে গেছে। এছাড়া ‘ব্ল্যাফমাস্টার’ ও ‘ফির হেরে ফেরি’-র মতো ছবিতে তাঁর কমিক টাইমিং চিরস্মরণীয়।

বিতর্ক ও মিটু আন্দোলন: কাজের পাশাপাশি বিতর্কও নানার ছায়াসঙ্গী ছিল। ২০০৮ সালে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ ছবির সেটে অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ তোলেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে ভারতের মিটু আন্দোলনের ঝড় যখন ওঠে, সেইসময় এই পুরোনো মামলার জেরে ফের বিতর্কে জড়ান অভিনেতা। যদিও ২০১৯ সালে মুম্বাই পুলিশ প্রমাণের অভাবে নানাকে সমস্ত অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয় এবং রিপোর্ট জমা দেয়।

পাশাপাশি ‘যশবন্ত’ ছবির সেটে সহ-অভিনেত্রী মধুকে না জানিয়ে থাপ্পড় মারার ঘটনাও একসময় বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। তবে কোনো বিতর্কই তাঁর অভিনয়ের ধার কমাতে পারেনি। ২০১০ এর দশকে ‘রাজনীতি’, ‘নটসম্রাট’, এবং ‘আব তক ছাপ্পান ২’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় সমালোচকদের মুগ্ধ করেছে। শেষ পর্দা উন্মোচন২০২৬ সালে বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত ‘ও রোমিও’ ছবিতে একজন ছকভাঙা পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় অভিনয়ই ছিল পর্দায় নানা পাটেকরের শেষ কাজ। এর ঠিক ছ’মাস পরেই গোয়ার মাটিতে চিরতরে শান্ত হলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই অন্যতম সেরা ‘শিল্পী’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *