ভারতের রাশিয়ান তেল কেনা নিয়ে আপত্তি থাকা আমেরিকাই এবার প্রকাশ্যে বলল, রাশিয়া থেকে ভারত তেল কিনতে পারে। এর জন্য আগামী ৩০ দিনের জন্য ভারতকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের আবহে হরমুজ প্রণালীতে শ’য়ে শ’য়ে ট্যাঙ্কার আটকে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম রকেট গতিতে উর্ধ্বমুখী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে ভারতকে রাশিয়ার থেকে তেল কেনার ‘ছাড়’ দিল আমেরিকা। ভারতকে রাশিয়ার তেল কিনতে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্দেশিকায় সই করেছেন। তাতে বলা হয়েছে, ইতিমধ্যেই যে রাশিয়ান তেল সাগরে রয়েছে, তা কিনতে পারে ভারতীয় শোধনাগারগুলি।
ভারতের ওপর থেকে শাস্তিমূলক শুল্ক প্রত্যাহার
এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে এক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করে ভারতের পণ্যের ওপর থেকে শাস্তিমূলক ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাশিয়ান তেল কেনার জন্যে বিগত বশ কয়েক মাস ধরে এই শুল্ক ধার্য করা ছিল ভারতের ওপর। তবে সম্প্রতি ট্রাম্প এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছিলেন যে নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটন একটি বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। সেই চুক্তির ফলে ভারতের পণ্যের ওপর থেকে শাস্তিমূলক শুল্ক কমায় আমেরিকা। তবে সেই সময় ট্রাম্প ‘হুঁশিয়ারি’ দিয়েছিলেন, ভারত যদি আবার রাশিয়ার তেল কেনে, তাহলে ভারতের ওপর ফের শুল্ক চাপানো হবে। পরে বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত ‘ফ্যাক্টশিট’-এ হোয়াইট হাউজ প্রথমে দাবি করে, ভারত রাশিয়ান তেল কেনা বন্ধ করবে। এবং সেই ফ্যাক্টশিট জারির একদিনের মাথায় তা ‘সংশোধন’ করা হয়। এবং বলা হয়, ভারত রুশ তেল কেনা কমানোর চেষ্টা করবে।
রাশিয়ান তেল কেনা নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আগের বক্তব্য
এর আগে রাশিয়া থেকে তেল কেনার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে নয়াদিল্লি বলেছিল যে এই সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থে গ্রহণ করা হয়েছে। সেই সময় ভারত জানিয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে বিশ্ববাজারে যাতে তেলের দাম না বেড়ে যায়, তার জন্য আমেরিকাই ভারতকে বলেছিল রুশ তেল কিনতে। তবে ট্রাম্প মুখে দাবি করেছিলেন, রাশিয়ার থেকে তেল কেনায় ভারতের ওপর শুল্ক চাপানো হয়েছিল। তবে রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার বাণিজ্য বেড়েছে ট্রাম্পের জমানাতেই। এদিকে ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে মধ্যস্থতার দাবি করেছিলেন ট্রাম্প। ভারত সেই দাবি অস্বীকার করে। এরপর থেকেই নিজের মনের মতো গল্প বানিয়ে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি নাকি মোদীকে ফোন করে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলেছিলেন। এবং যুদ্ধ করলে বাণিজ্য চুক্তি না করা নিয়ে মোদীকে বার্তা দেওয়ার পর নাকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নাকি বলেছিলেন, ‘না না বাণিজ্য চুক্তি তো করতে হবে’। ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী মোদীকে ফোন করে করেছিলাম। আমি দুই দেশকেই বলেছিলাম যে আমি প্রতিটি দেশের উপর ২৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করব… যার মানে তারা কখনও আর আমেরিকার সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে না। আমি শুল্কের কথা বলে শুধু ভালো ভাষায় বোঝাতে চেয়েছিলাম, আমরা আপনার সাথে ব্যবসা করতে চাই না।’ তবে সম্প্রতি পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। ভারত-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষতে প্রলেপ পড়েছে। ভারতের শুল্ক কমার দিনেই নয়াদিল্লি এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কথাবার্তা এগিয়েছে। আর ইরান যুদ্ধের আবহে ফের ভারতকে রুশ তেল কিনতে বলল আমেরিকা।ভারতের কাছেই অপেক্ষায় রাশিয়ান তেল

এদিকে এর আগেই রাশিয়া জানিয়েছে, তারা ভারতে তেল পাঠাতে প্রস্তুত। ভারতীয় জলসীমায় অ-রাশিয়ান জাহাজে প্রায় ৯.৫ মিলিয়ন ব্যারেল রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল রয়েছে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা ভারতে পৌঁছাতে পারে। একটি সূত্র সরাসরি রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছে। এই সব অ-রাশিয়ান কার্গোগুলি ঠিক কোথায় যাচ্ছে তা অবশ্য বলতে অস্বীকার করেছেন সেই সূত্র। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে ২৫ দিনের অপরিশোধিত তেল মজুদ রয়েছে। ভারত সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের আবহে নয়াদিল্লি অন্যান্য সরবরাহ শৃঙ্খলের সন্ধান করছে। ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ অপরিশোধিত আমদানি হরমুজ প্রণালী থেকে আসে। এটা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি রুট। এবং এই রুটটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার জেরে অন্য বিকল্পের খোঁজে গোটা বিশ্ব।
ভারতীয় শোধনাগারগুলি প্রতিদিন প্রায় ৫.৬ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়া করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানিয়েছে, ভারতের অপরিশোধিত চাহিদার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মেটাতে সহায়তা করতে প্রস্তুত রাশিয়া। রিপোর্ট অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ভারতে অপরিশোধিত রাশিয়ান তেল আমদানি কমে দৈনিক ১.১ মিলিয়ন ব্যারেল হয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পরে যা সর্বনিম্ন। সূত্রটি জানিয়েছে যে ফেব্রুয়ারিতে অবশ্য রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানির হার ৩০ শতাংশে ফিরে এসেছে। দুটি শোধনাগারের সূত্র জানিয়েছে, ভারতীয় রিফাইনারগুলি রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। তবে রাশিয়ার তেল কেনার হার বৃদ্ধির বিষয়টি সরকারের নির্দেশনার উপর নির্ভর করবে। কারণ ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এদিকে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ভারত যদি ফের রাশিয়ার তেল কেনা বাড়ায়, তাহলে তিনি ফের শুল্ক চাপাবেন ভারতের ওপরে। যদিও বা ট্রাম্পের শুল্ক নীতিকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। এদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দামে আগুন লাগার আশঙ্কা দেখা দিতেই নিজের আগের অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে দাঁড়ালেন ট্রাম্প।