মেয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে রাজধানীর রাজপথে ধরনায় বসেছিলেন তাঁরা। দাবি ছিল, অঙ্কিতা ভাণ্ডারী হত্যা মামলায় ‘ভিআইপি যোগ’-এর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তদের তালিকায় নাম থাকা বিজেপি নেতা দুষ্মন্ত কুমার গৌতমের সিকিমের রাজ্যপাল পদে নিয়োগ স্থগিত রাখতে হবে। কিন্তু রাত পেরিয়ে বৃহস্পতিবার ভোর ৪টে নাগাদ ইন্ডিয়া গেট থেকে আটক করা হল অঙ্কিতার বাবা-মাকে। তাঁদের সঙ্গে আটক করা হয় কংগ্রেস নেতা পবন খেড়া-সহ বিরোধী দলের একাধিক নেতা ও কর্মীকেও। যদিও প্রায় দু’ঘণ্টা পরে অঙ্কিতার বাবা-মাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। মেয়ের বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ধরনায় বসতে না দিলে বাড়িতেই অনশন শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন অঙ্কিতার মা।
২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বাবার
অঙ্কিতার বাবা সরকারের কাছে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, দুষ্মন্ত গৌতমের রাজ্যপাল পদে নিয়োগ বাতিল করতে হবে। তা না হলে দেশ জুড়ে মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করবেন। পরিস্থিতির জন্য সরকারকেই দায় নিতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
অন্য দিকে, অঙ্কিতার মা জানিয়েছেন, প্রশাসন তাঁদের ধরনায় বসতে না দিলে বাড়িতে থেকেই অনশন করবেন। মেয়ের মৃত্যুর বিচার এবং ভিআইপি যোগের অভিযোগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান থেকে সরবেন না বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে রাজনৈতিক চাপানউতোরও বেড়েছে। কংগ্রেস নেত্রী সুপ্রিয়া শ্রীনাতে, পবন খেড়া এবং কাজি নিজামুদ্দিন পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, মেয়ের বিচার চেয়ে আন্দোলনরত অসহায় বাবা-মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ করা অনুচিত।
কেন দুষ্মন্ত গৌতমকে ঘিরে আপত্তি?
সিকিমের রাজ্যপাল হিসেবে প্রাক্তন বিজেপি নেতা দুষ্মন্ত কুমার গৌতমের নিয়োগকে কেন্দ্র করেই নতুন করে এই বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। অঙ্কিতার পরিবারের অভিযোগ, ২০২২ সালের ওই হত্যাকাণ্ডের পিছনে কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। সেই তদন্তের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দুষ্মন্ত গৌতমের নিয়োগ স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এই দাবিকে সমর্থন জানিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় ইন্ডিয়া গেটে ধরনায় যোগ দেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা এবং দলের অন্য নেতারা। অঙ্কিতার বাবা রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেন গৌতমের নিয়োগ কার্যকর না করা হয়।
তবে দুষ্মন্ত গৌতমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত নয়। তিনি নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে মানহানির আইনি পদক্ষেপও করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে ভিআইপি যোগের অভিযোগ এবং তার তদন্তের অগ্রগতি আলাদা করে বিচার করা জরুরি।

কী হয়েছিল অঙ্কিতার সঙ্গে?
২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর উত্তরাখণ্ডের ঋষিকেশের কাছে একটি রিসর্টে রিসেপশনিস্টের কাজ করতেন ১৯ বছরের অঙ্কিতা। অভিযোগ, রিসর্টের মালিক পুলকিত আর্য তাঁকে যৌন পরিষেবা দিতে চাপ দিয়েছিলেন। তাতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে খুন করা হয়। ঘটনার ছ’দিন পরে একটি খাল থেকে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়।
এই মামলায় পুলকিত আর্য এবং তাঁর দুই সহযোগীকে ২০২৫ সালের মে মাসে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত। কিন্তু পরিবারের দাবি, মূল খুনের মামলায় দণ্ড ঘোষণা হলেও সম্ভাব্য প্রভাবশালী ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সম্পূর্ণ নিষ্পত্তি হয়নি। সেই কারণেই নতুন করে আন্দোলনে নেমেছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে, অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলায় ন্যায়বিচারের দাবিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বাবা-মাকে আটকের ঘটনায় বিরোধীরা সরব হলেও তাঁদের মুক্তি দিয়েই পরিস্থিতি শেষ হয়নি। বরং রাজ্যপাল নিয়োগ বাতিলের দাবি এবং অনশনের হুঁশিয়ারিতে আন্দোলন আরও জোরালো হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। আগামী দিনে সরকার ও প্রশাসন এই দাবির জবাবে কী পদক্ষেপ করে, এখন সেদিকেই নজর।