দিল্লির যন্তর মন্তরে আর বিক্ষোভ দেখানো যাবে না। প্রতিবাদের এই ঐতিহাসিক স্থানকে নিষিদ্ধ করে বিকল্প তিনটি জায়গা নির্দিষ্ট করেছে দিল্লি পুলিশ। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেন এক আবেদনকারী। বৃহস্পতিবার মামলার শুনানিতে কেন্দ্রীয় সরকার এবং দিল্লি পুলিশের বক্তব্য জানতে চাইল শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আপাতত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে নিজেদের অবস্থান জানানোর সুযোগ দেওয়া হবে। তাঁদের জবাব সন্তোষজনক না হলে আইন নিজের পথে চলবে। আদালতের এই মন্তব্যে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অধিকার নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।
যন্তর মন্তরের বদলে নতুন তিন জায়গা
দিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে শুরু করে নাগরিক অধিকার, ভোটার তালিকা এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছে সেখানে। কিন্তু সম্প্রতি ওই জায়গাকে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান হিসাবে বাতিল করেছে দিল্লি পুলিশ।
১২ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তিতে যন্তর মন্তরের পরিবর্তে তিনটি জায়গাকে বিক্ষোভ ও অবস্থানের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। সেগুলি হল মধ্য দিল্লির রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড। নতুন জায়গাগুলিতে কী নিয়মে বিক্ষোভ করা যাবে, তা নিয়ে আলাদা নির্দেশিকা প্রকাশের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
দিল্লি পুলিশের দাবি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে গঠিত একটি কমিটির সুপারিশ মেনেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে যন্তর মন্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদস্থল বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
কী বলল সুপ্রিম কোর্ট?
যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের আর্জি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন আইনজীবী স্বাতী সিং মালিক। তাঁর আবেদনে বলা হয়েছে, বিকল্প হিসাবে নির্ধারিত জায়গাগুলিতে বিক্ষোভ করতে অর্থ দিতে হতে পারে। যন্তর মন্তরের ক্ষেত্রে এমন আর্থিক বাধ্যবাধকতা ছিল না। ফলে নতুন ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের অধিকারকে সীমিত করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আবেদনকারী।

এ ছাড়াও, ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই মামলায় যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ করার অধিকার স্বীকার করা হয়েছিল, যদিও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগও রাখা হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্র এবং দিল্লি পুলিশের কাছে জবাব চেয়ে নোটিস জারি করে। আদালতের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে আগে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। তাঁদের জবাবে আদালত সন্তুষ্ট না হলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করা হবে।
রাজনৈতিক বিক্ষোভের আবহে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
যন্তর মন্তরকে ঘিরে বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন দিল্লিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন চলছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি পথে নেমেছে। একই ইস্যুতে আন্দোলন করছে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি।
এই পরিস্থিতিতে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন বাড়িয়েছে। এক দিকে প্রশাসনের যুক্তি, নির্দিষ্ট জায়গায় জমায়েত হলে নিরাপত্তা ও যান চলাচল সামলানো সহজ হবে। অন্য দিকে, আবেদনকারীদের বক্তব্য, বিকল্প স্থান নির্ধারণ করলেই মানুষের প্রতিবাদের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে না। জায়গাগুলি কতটা সহজে পৌঁছনো যায় এবং সেখানে আন্দোলন করার খরচ কত, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন কেন্দ্র এবং দিল্লি পুলিশের জবাবের দিকে নজর থাকবে। আদালত শেষ পর্যন্ত যন্তর মন্তরকে ফের বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান হিসাবে স্বীকৃতি দেয় কি না, সেই সিদ্ধান্ত দিল্লির প্রতিবাদ আন্দোলনের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে বৃহস্পতিবারের শুনানিতে যন্তর মন্তর নিয়ে চূড়ান্ত কোনও নির্দেশ দেওয়া হয়নি।