ড্রোনের হামলা মোকাবিলায় ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আরও একটি নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ার পথে। ৩০ কিলোওয়াট শ্রেণির একটি ডিরেক্টেড এনার্জি ওয়েপন বা লেজার অস্ত্রকে এখন পরীক্ষামূলক পর্যায় থেকে উৎপাদনের দিকে নিয়ে যেতে চাইছে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা DRDO। এই অস্ত্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল ড্রোন, ড্রোনের ঝাঁক এবং বিভিন্ন ধরনের মানবহীন আকাশযানকে দূর থেকেই নিষ্ক্রিয় করা।
DRDO-র এই লেজার সিস্টেমটিকে একটি ট্রাকের উপর বসানো হবে। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত নিয়ে গিয়ে মোতায়েন করা সম্ভব হবে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৩০ কিলোওয়াটের এই লেজার সিস্টেম প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরের একাধিক ধরনের আকাশপথের লক্ষ্যবস্তুকে আক্রমণ করতে পারবে। এর মধ্যে রয়েছে ড্রোনের ঝাঁক, ফিক্সড-উইং UAV এবং নজরদারি কাজে ব্যবহৃত কিছু সেন্সর বা সরঞ্জাম।
এই অস্ত্রের কাজ প্রচলিত মিসাইল বা গোলার থেকে আলাদা। লেজার অস্ত্র কোনও বিস্ফোরক ওয়ারহেড ছুড়ে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে না। তার বদলে অত্যন্ত শক্তিশালী আলোকরশ্মি নির্দিষ্ট একটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত করা হয়। যথেষ্ট সময় ধরে সেই রশ্মি লক্ষ্যবস্তুর গুরুত্বপূর্ণ অংশে পড়লে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত বা নিষ্ক্রিয় হতে পারে। এর ফলে প্রচলিত গোলাবারুদের প্রয়োজন হয় না এবং আলোর গতিতে শক্তি লক্ষ্যে পৌঁছে যায়।
তবে শুধু শক্তিশালী লেজার থাকলেই এই অস্ত্র কার্যকর হবে না। প্রথমে শত্রুর ড্রোন শনাক্ত করতে হবে। তারপর সেটির অবস্থান ও গতিপথ নির্ভুলভাবে অনুসরণ করতে হবে। এরপর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে লেজারকে লক্ষ্যবস্তুর নির্দিষ্ট অংশে স্থির রাখতে হবে। অর্থাৎ রাডার, ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর, ফায়ার-কন্ট্রোল সিস্টেম এবং লেজার—সবকিছুর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় প্রয়োজন।
DRDO ইতিমধ্যেই এই ৩০ কিলোওয়াট সিস্টেমের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর শেষ পর্যায়ের পরীক্ষা ২০২৫ সালের আগস্টে শেষ হয়েছিল। এখন পরবর্তী ধাপে একটি শিল্প সংস্থা বা বেসরকারি অংশীদার বেছে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে সেই প্রক্রিয়া শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচিত সংস্থার সঙ্গে মিলে First-of-Production Model বা FOPM তৈরি করা হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে আগামী ছয় মাসের মধ্যেই অস্ত্রটি সেনাবাহিনীতে পুরোপুরি মোতায়েন হয়ে যাবে।
ভারতের জন্য এই প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বেড়েছে সস্তা ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ার কারণে। তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা ড্রোন দিয়ে বিপক্ষ বড় ধরনের নজরদারি বা আক্রমণাত্মক চাপ তৈরি করতে পারে। প্রতিটি ড্রোনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত দামি মিসাইল ব্যবহার করলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার খরচও বেড়ে যায়। সেই জায়গায় লেজার একটি অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা স্তর হিসেবে কাজ করতে পারে। মিসাইলের পাশাপাশি কামান, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং লেজার—সবকিছুকে একসঙ্গে ব্যবহার করে বহুস্তরীয় ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব।

DRDO-র ডিরেক্টেড এনার্জি কর্মসূচিতে শুধু ৩০ কিলোওয়াট নয়, আরও কম ক্ষমতার সিস্টেমও এগিয়ে চলেছে। ২ কিলোওয়াট শ্রেণির একটি সিস্টেম ইতিমধ্যে উৎপাদনে রয়েছে এবং ১০ কিলোওয়াট সংস্করণও পরবর্তী পর্যায়ে এগোচ্ছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ ধাপে ধাপে বেশি ক্ষমতার লেজার অস্ত্র তৈরির দিকে এগোচ্ছে ভারত।
তবে লেজার অস্ত্রের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। খারাপ আবহাওয়া, ধোঁয়া, ধুলো বা দৃষ্টিসীমা কমে গেলে লেজারের কার্যকারিতা প্রভাবিত হতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক শক্তি এবং অত্যন্ত নির্ভুল beam control-ও প্রয়োজন। ফলে ৩০ কিলোওয়াট লেজার ভবিষ্যতে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে, তবে এটি মিসাইল বা অন্যান্য অস্ত্রের সম্পূর্ণ বিকল্প নয়; বরং সেগুলির সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহারের জন্য একটি নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি হচ্ছে।