আরব সাগরে সোমালি জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল ইরানের একটি মাছ ধরার জাহাজ। সেই জাহাজ থেকে ২০ জন নাবিককে উদ্ধার করল ভারতীয় নৌসেনা। মুম্বই উপকূল থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে এই অভিযান চালানো হয়। টানা ৪৮ ঘণ্টার পরিকল্পিত অভিযানের পর জাহাজটিকে জলদস্যুদের কবল থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই অভিযানে ভারতীয় নৌসেনাকে সাহায্য করেছে বায়ুসেনাও। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নৌসেনার এই সাফল্যের প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত যে কোনও ধরনের হুমকির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।
উদ্ধার হওয়া জাহাজটির নাম ‘আজিনি’। গত ২৯ অক্টোবর সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলে জাহাজটি ছিনতাই করে জলদস্যুরা। সোমালিয়ার বান্দর বায়লা এবং হাফুন শহরের মধ্যবর্তী সমুদ্র এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। জাহাজটিতে হামলা চালিয়েছিল ভারী অস্ত্রে সজ্জিত ১২ জন জলদস্যু। তাঁদের হাতে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। সেই সময় জাহাজে ইরানের নাবিক এবং সোমালিয়ার নিরাপত্তারক্ষী মিলিয়ে ২৩ জন ছিলেন বলে সংবাদ সংস্থা এপি জানিয়েছে।
জলদস্যুদের হাতে জাহাজটি চলে যাওয়ার খবর সামনে আসতেই সতর্ক হয় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। মেরিটাইম সিকিউরিটি সেন্টার ইন্ডিয়ান ওশান (এমএসসিআইও) এই ছিনতাইয়ের বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করে। তাদের আশঙ্কা ছিল, জলদস্যুরা জাহাজটিকে ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজের উপর আরও হামলা চালাতে পারে। কারণ, জাহাজটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জলপথের দিকে এগোচ্ছিল। জলদস্যুদের ভাষায় এই ধরনের জাহাজকে ‘মাদারশিপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ, একটি বড় জাহাজকে ঘাঁটি করে ছোট নৌকা নিয়ে অন্য জাহাজে হামলা চালানো হয়।
৪৮ ঘণ্টার অভিযানে নৌসেনা-বায়ুসেনা
খবর পাওয়ার পরই জাহাজটির অবস্থান চিহ্নিত করতে শুরু করে ভারতীয় নৌসেনা। শুরু হয় দীর্ঘ অভিযান। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা ধরে চলে নজরদারি এবং উদ্ধারকাজের প্রস্তুতি। শেষ পর্যন্ত সোমবার, ২ নভেম্বর, আরব সাগরে জাহাজটির নাগাল পায় নৌসেনা। মুম্বই থেকে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে অভিযানটি চালানো হয়। জলদস্যুদের হারিয়ে জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় ভারতীয় বাহিনী। উদ্ধার করা হয় ২০ জন নাবিককে। পুরো অভিযানে বায়ুসেনার সাহায্যও নেওয়া হয়েছিল।
অভিযানের পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সমাজমাধ্যমে নৌসেনার প্রশংসা করেন। তিনি জানান, দ্রুত জাহাজটির অবস্থান চিহ্নিত করা, জলদস্যুদের বাধা অতিক্রম করা এবং নাবিকদের নিরাপদে মুক্ত করার ঘটনা ভারতীয় নৌসেনার প্রস্তুতির পরিচয় দিয়েছে। তাঁর মতে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা বজায় রাখতে দেশের বাহিনী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে সক্ষম।

আবার সক্রিয় সোমালি জলদস্যুরা
আন্তর্জাতিক জলপথে নতুন করে সোমালি জলদস্যুদের তৎপরতা বাড়ছে। সংবাদ সংস্থা এপি-র তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে অগস্টের মধ্যে অন্তত ছ’টি বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকটি হামলা সোমালিয়ার উপকূল থেকে অনেক দূরেও চালানো হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এমটি অনার ২৫ নামে একটি তেলবাহী জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনায় পাঁচ নাবিকের মৃত্যুর কথাও জানিয়েছিল পুন্তল্যান্ড প্রশাসন।উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ২৩ অক্টোবর থেকে এডেন উপসাগরে নিয়মিত জলদস্যু দমনের টহল চালাচ্ছে ভারতীয় নৌসেনা। ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করাই এই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য। ‘আজিনি’ উদ্ধারের ঘটনা সেই দায়িত্ব পালনেরই সাম্প্রতিক নজির।