২০১৫-র ভুল থেকে শিক্ষা নেয়নি কলকাতা! চোরবাগানের মৃত্যু ফেরাল ১১ বছর আগের স্মৃতি

Spread the love

পুজোর ভিড় সামলাতে কলকাতার দক্ষতা নিয়ে গর্বের শেষ নেই। দুর্গাপুজো হোক বা বড়দিনের পার্ক স্ট্রিট, ইডেন গার্ডেন্সে ক্রিকেট কিংবা মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের ডার্বি, বিপুল জনসমাগম সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে শহরের। পুজোর কয়েক দিন রাস্তায় নামেন হাজার হাজার পুলিশকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক। থাকে ব্যারিকেড, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং নজরদারির নানা ব্যবস্থা। তা হলে চোরবাগানে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটল কী ভাবে? ১৭ জনের মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নই তুলেছে এনডিটিভির একটি বিশ্লেষণ। সংবাদমাধ্যমটির নিউজ এডিটর চন্দ্রজিৎ মিত্রের লেখায় উঠে এসেছে ২০১৫ সালের দেশপ্রিয় পার্কের ঘটনার প্রসঙ্গও। তাঁর বক্তব্য, ১১ বছর আগে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা থেকেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেয়নি কলকাতা।

২০১৫ সালের স্মৃতি ফিরল

২০১৫ সালের ১৮ অক্টোবর। দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কে তৈরি হয়েছিল ৮৮ ফুটের বিশাল দুর্গাপ্রতিমা। প্রচারে সেটিকে বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু দুর্গাপ্রতিমা বলে তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিমা দেখতে মানুষের ঢল নামে। দীর্ঘ লাইন সামলাতে গিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অন্তত ১১ জন আহত হয়েছিলেন।

এ বারের চোরবাগানের ঘটনার সঙ্গে সেই ঘটনার মিল দেখছেন চন্দ্রজিৎ। তাঁর মতে, বছরের পর বছর নির্বিঘ্নে ভিড় সামলানোর অভিজ্ঞতা কলকাতাকে আত্মতুষ্ট করে তুলেছিল। সেই আত্মবিশ্বাসের আড়ালে থেকে গিয়েছিল বিপদের সম্ভাবনা। অথচ উত্তর কলকাতার পুরনো পাড়াগুলিতে পরিস্থিতি দক্ষিণ কলকাতার মতো নয়। সেখানে সরু গলি, ঘনবসতিপূর্ণ বাড়ি এবং মাথার উপর জট পাকানো বৈদ্যুতিক তার রয়েছে। কোথাও কোথাও গলি মাত্র চার থেকে পাঁচ ফুট চওড়া। এমন জায়গায় বিপুল মানুষের ভিড় জমলে বিপদের আশঙ্কা থেকেই যায়।

স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ কোথায়?

পুজোর ভিড় সামলাতে সাধারণত স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি পুলিশ, পুরসভার কর্মী এবং বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীদের কাজে লাগানো হয়। ব্যারিকেড দিয়ে ভিড়ের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সিসিটিভি ও ড্রোনের সাহায্যে নজর রাখা হয় জনসমাগমের উপর। কিন্তু চোরবাগানের মতো জনপ্রিয় মণ্ডপে সেই ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের অভিযোগ, মণ্ডপে পর্যাপ্ত পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন না। প্রবেশ ও বেরোনোর পথও ছিল সরু। আলো কম থাকায় পরিস্থিতি সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে বলে দাবি তাঁদের। দুর্ঘটনার দু’দিন আগের একটি ভিডিয়োতেও মণ্ডপে দড়ির ব্যারিকেড টপকে মানুষের ভিড় এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়েছিল বলে জানিয়েছে এনডিটিভি। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে।

বৃষ্টি, ঘোষণা এবং আতঙ্ক

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, দুর্ঘটনার আগে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে দ্রুত মণ্ডপে ঢোকার চেষ্টা করেন দর্শনার্থীরা। ভিতরে থাকা অনেকে বৃষ্টি কমার অপেক্ষায় ছিলেন। ফলে মণ্ডপে ভিড় ক্রমশ বাড়তে থাকে। কত মানুষের চাপ নেওয়ার ক্ষমতা ছিল মণ্ডপটির, তার চেয়ে বেশি মানুষ সেখানে ঢুকে পড়েছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, উদ্যোক্তাদের একটি ঘোষণা থেকে বিপত্তি ঘটে থাকতে পারে। তবে ঠিক কী ঘোষণা করা হয়েছিল এবং তার ফলে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

চন্দ্রজিতের বিশ্লেষণে মূল প্রশ্ন একটাই। নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে কি না, সেই নজরদারি কতটা কার্যকর? শুধু পুলিশ মোতায়েন কিংবা ব্যারিকেড তৈরি করলেই ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মণ্ডপের ধারণক্ষমতা মেনে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, জরুরি নির্গমনপথ খোলা রাখা এবং বিপদের আগাম সংকেত চিহ্নিত করা জরুরি। চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনা সেই পুরনো প্রশ্নই ফের সামনে আনল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *