Bangladeshi saved by Kolkata doctors: পেটের ভিতরে শরীরের প্রধান রক্তনালী অস্বাভাবিক ফুলে যাওয়া বা ‘অ্যাবডোমিনাল অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম’-কে চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রায়শই বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কোনওরকম পূর্বলক্ষণ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধা এই বিপজ্জনক ফোলা জায়গাটা হঠাৎ ফেটে গেলে মারাত্মক রক্তক্ষরণে মুহূর্তের মধ্যে প্রাণহানি পর্যন্ত হতে পারে। সম্প্রতি এরকমই মারাত্মক রোগে আক্রান্ত বাংলাদেশি প্রৌঢ়কে সুস্থ করে তুলেছেন কলকাতার মুকুন্দপুরের মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসকরা। কোনওরকম জটিল ও বড় অস্ত্রোপচার ছাড়াই রক্তনালীতে ছোটো ছিদ্র করে আধুনিক ‘এন্ডোভাসকুলার অ্যাওর্টিক রিপেয়ার’ পদ্ধতির মাধ্যমে তাঁকে সুস্থ করে তুলেছেন।
নীরব ঘাতক মৃত্যুর দিকে ঠেলছিল, জানতেনও না
হাসপাতাল সূত্রে খবর, বাংলাদেশের বাসিন্দা ৫৪ বছরের ফেদু সাহা দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে ধূমপান করতেন এবং ২০১৬ সালে তাঁর হার্টের বাইপাস অস্ত্রোপচার হয়েছিল। চলতি বছরের ৫ জুলাই কিডনির চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সঙ্গে পেট ও পিঠে তীব্র যন্ত্রণা ছিল। বাঁ-পায়ে ছিল ব্যথা। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারছিলেন না।
আর সমস্যাটা যে জটিল, তা ধরা পড়ে পরীক্ষার পরে। বিপদের গুরুত্ব বুঝে কালবিলম্ব না করে রোগীকে রক্তনালী ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের বিশেষ দলের কাছে পাঠান। নেফ্রোলজি ও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিভাগের ক্লিনিক্যাল লিড অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তীতে সিটি অ্যাঞ্জিওগ্রাফির রিপোর্ট আসার পর চিকিৎসকদের উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। দেখা যায়, ফেদুর পেটের প্রধান রক্তনালীর নিচের অংশটি বেশ বড় আকারে ফুলে উঠেছে। শুধু তাই নয়, সেই অংশে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছে এবং রক্তনালীর ভিতরের স্তরে ছিঁড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসরা জানিয়েছেন, ফেদুর বাঁ-পায়ে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হচ্ছিল। উপরন্তু, প্রধান রক্তনালীর ফোলা অংশটি এতটাই বড় রূপ নিয়েছিল যে পেটের আশপাশের অঙ্গগুলির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছিল। এর থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর অসহ্য পেট-পিঠের যন্ত্রণা ও হাঁটার ক্ষেত্রে সমস্যা।
EVAR পদ্ধতির মাধ্যমে অত্যাধুনিক চিকিৎসা
পরিস্থিতির জটিলতা বিবেচনা করে যৌথভাবে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেয় ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি ও ভাসকুলার সার্জারি দল। কার্ডিওলজিস্ট ও ক্যাথ ল্যাব বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর সৌম্য পাত্র এবং কার্ডিওথোরাসিক ও ভাসকুলার সার্জনের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অরিজিৎ দত্ত এই EVAR পদ্ধতি সম্পাদন করেন।
সাধারণত চিকিৎসায় পেট কেটে বড় ধরনের অস্ত্রোপচার করতে হয়, যাতে ঝুঁকি এবং যন্ত্রণা দুটোই বেশি হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বেছে নেন ন্যূনতম রক্তপাতের আধুনিক প্রযুক্তি। রক্তনালীতে মাত্র একটি ছোটো ছিদ্র করে ভিতরে প্রবেশ করানো হয় একটি বিশেষ ‘স্টেন্ট গ্রাফ্ট’ (ধাতব জালের সঙ্গে বিশেষ কাপড়ে তৈরি একটি নল)। ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালীর ভিতর এটি সঠিকভাবে বসিয়ে দেওয়ার ফলে রক্ত চলাচলের জন্য একটি নতুন ও বিকল্প নিরাপদ পথ তৈরি হয়। এতে ফোলা অংশে রক্তপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে রক্তনালীটি আর নতুন করে বড় হতে পারে না এবং ফেটে যাওয়ার আশঙ্কা চিরতরে দূর হয়। অস্ত্রোপচারের চূড়ান্ত ধাপে আধুনিক MANTA ক্লোজার ডিভাইস ব্যবহার করে রক্তনালীর প্রবেশপথটি অতি সূক্ষ্মভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কী বলছেন চিকিৎসকরা?
বিষয়টি নিয়ে ওই হাসপাতালের কার্ডিওলজিস্ট ও ক্যাথ ল্যাব বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর বলেন, ‘পেটের প্রধান রক্তনালীর বড় ফোলা খুবই বিপজ্জনক। এটি হঠাৎ ফেটে গেলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে রোগীর প্রাণহানিও হতে পারে। এই রোগীর ক্ষেত্রে ফোলার কারণে বাঁ-পায়ে রক্ত চলাচল কমে গিয়েছিল, ফলে তাঁর তীব্র ব্যথা এবং হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছিল। EVAR পদ্ধতিতে আমরা নিরাপদভাবে ফোলা অংশ বন্ধ করতে পেরেছি এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রেখেছি। বড় অস্ত্রোপচার এড়ানো গিয়েছে, ফলে রোগীও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আধুনিক এই চিকিৎসা পদ্ধতি জটিল রক্তনালীর রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।’