পিঠের নীচের দিকে বা কোমরের দুই ধারের তীব্র ব্যথা আমাদের অত্যন্ত পরিচিত একটি শারীরিক সমস্যা। আধুনিক জীবনযাত্রায় দীর্ঘক্ষণ অফিসে ডেস্কে বসে কাজ করা, কায়িক পরিশ্রমের অভাব কিংবা শোয়ার ভুল অভ্যাসের কারণে ব্যাক পেইন বা পিঠে ব্যথা ঘরে ঘরে দেখা যায়। তবে এই ব্যথায় ভুগতে থাকা অনেকেই একটি বড় দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েন—এই ব্যথা কি শুধুই মেরুদণ্ড, পেশি বা স্নায়ুর টান, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কিডনির কোনো মারাত্মক সমস্যা?
কিডনি আমাদের পিঠের দিকে, পাঁজরের ঠিক নিচে মেরুদণ্ডের দুই পাশে অবস্থিত। তাই কিডনিতে কোনো ইনফেকশন বা পাথর হলে সেই ব্যথা পিঠের নিচের দিকেই অনুভূত হয়। পেশি বা স্নায়ুর ব্যথা আর কিডনির ব্যথার লক্ষণ ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। সঠিক সময়ে এই দুই ব্যথার পার্থক্য চিনতে না পারলে বড় বিপদ ঘটতে পারে। লক্ষণ দেখে দুই ধরণের ব্যথা চেনার সহজ উপায় ও ডাক্তারি পরামর্শ জেনে নিন।
১. পেশি বা স্নায়ুজনিত ব্যথার প্রধান লক্ষণ (Muscle or Nerve Pain)
মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্ষয়, স্পন্ডিলাইটিস, ডিস্ক প্রোল্যাপ্স কিংবা পেশিতে টান পড়ার কারণে এই ধরণের ব্যথা তৈরি হয়।
- ব্যথার ধরন ও স্থান: এই ব্যথা সাধারণত পিঠের ঠিক মাঝে, কোমর বা নিতম্বের পেশিতে অনুভূত হয়। ব্যথাটি একটানা ভোঁতা অনুভূতি (Dull ache) বা হঠাৎ তীব্র টান লাগার মতো হতে পারে।
- নড়াচড়ায় ব্যথার পরিবর্তন: হাঁটাচলা করলে, উবু হয়ে বসলে, ঝুকলে বা ভারী জিনিস তুললে পেশি ও স্নায়ুর ব্যথা অনেকটা বেড়ে যায়। আবার বিশ্রাম নিলে বা গরম শেঁক দিলে ব্যথা সাময়িকভাবে কমে।
- অবশ ভাব বা ঝিনঝিন করা: যদি স্নায়ু বা নার্ভে চাপ পড়ে (যেমন—সাইয়াটিকা), তবে ব্যথা কোমর থেকে সোজা পায়ের দিকে নেমে যায় এবং পা ঝিনঝিন করা বা অবশ ভাব দেখা দিতে পারে।
২. কিডনির সমস্যার ব্যথার প্রধান লক্ষণ (Kidney Pain)
কিডনিতে পাথর (Kidney Stones) বা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন (Pyelonephritis) হলে মূলত কিডনিতে ব্যথা অনুভব হয়।
- ব্যথার ধরন ও স্থান: কিডনির ব্যথা হয় পিঠের একদম নীচের অংশে, পাঁজরের ঠিক নিচে একপাশে বা দুই পাশে (Flank Pain)। এই ব্যথা অত্যন্ত তীব্র, গভীর ও মোচড় দেওয়া স্বভাবের হয় এবং হুটহাট তরঙ্গের মতো আসে-যায়।
- ব্যথা ছড়িয়ে পড়া: কিডনির ব্যথা সাধারণত স্থান পরিবর্তন করে। পিঠের নিচের ধার থেকে শুরু হয়ে এই ব্যথা তলপেট এবং কুঁচকির দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
- শরীরের ভঙ্গি বদলালে কাজ হয় না: শোয়া, বসা বা চলাফেরার ভঙ্গি বদলালেও কিডনির ব্যথার তীব্রতা কমে না। বিশ্রাম নিলেও ব্যথার উপশম হয় না।
- অন্যান্য আনুষঙ্গিক লক্ষণ: কিডনির ব্যথার সাথে প্রায়শই প্রস্রাবে তীব্র জ্বালাভাব, প্রস্রাবের রঙ লাল বা ঘোলাটে হওয়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, তীব্র জ্বর, কাঁপুনি এবং গা গোলানো বা বমির লক্ষণ দেখা দেয়।

৩. লক্ষণ দেখে একনজরে পার্থক্য চেনার উপায়
- স্থান: পেশির ব্যথা কোমরের মাঝে ও পেশিতে থাকে; কিডনির ব্যথা পিঠের ধারের গভীর ভেতরে পাঁজরের নিচে হয়।
- ছড়িয়ে পড়া: পেশির ব্যথা পা পর্যন্ত নামতে পারে; কিডনির ব্যথা তলপেট ও কুঁচকিতে ছড়ায়।
- উপশম: পেশির ব্যথা বিশ্রামে বা শেঁকে কমে; কিডনির ব্যথা কমার জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
- প্রস্রাবের পরিবর্তন: পেশির ব্যথায় প্রস্রাবে কোনো সমস্যা থাকে না; কিডনির ব্যথায় প্রস্রাবে তীব্র জ্বালা বা রক্তের উপস্থিতি দেখা যায়।
কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন?
যদি পিঠের ব্যথার সাথে তীব্র জ্বর আসে, প্রস্রাবের রঙ বদলে যায় বা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে আসে এবং গা গোলানো ও বমি হতে থাকে, তবে বিন্দুমাত্র দেরি না করে অবিলম্বে নেফ্রোলজিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।