ফিলিপিন্সের রাজধানী ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত আসিয়ান রিজিওনাল ফোরাম (এআরএফ)-এর মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ফের কাশ্মীর ও সিন্ধু জলচুক্তি ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে সরব হল পাকিস্তান। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও বিদেশমন্ত্রী ইসহাক দার দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান এবং দাবি করেন, সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিতের মতো বিষয় আন্তর্জাতিক আইন মেনে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত। তবে পাকিস্তানের এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারত।
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে পাকিস্তানের অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক’ বলে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক মঞ্চকে পাকিস্তান আবারও মিথ্যা প্রচার, রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়ানো এবং নিজেদের সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে মদতের রেকর্ড থেকে আন্তর্জাতিক নজর ঘোরানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট ভাষায় জানান, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য ও অভিন্ন অংশ ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এই বিষয়ে মন্তব্য করার কোনও অধিকার বা অবস্থান পাকিস্তানের নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সিন্ধু জলচুক্তি প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জয়সওয়াল বলেন, পাকিস্তানের লাগাতার সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে মদতের জবাব হিসেবেই ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পহেলগাঁওয়ে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তইবার মদতপুষ্ট হামলার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তিনি বলেন, পাকিস্তান যতদিন না বিশ্বাসযোগ্য ও স্থায়ীভাবে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়া বন্ধ করছে, ততদিন এই চুক্তি স্থগিতই থাকবে।
এছাড়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষক বিভ্রান্তিমূলক প্রচারের অভিযোগও তোলে ভারত। জয়সওয়াল বলেন, ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’-এর মতো ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার করে পাকিস্তান উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তাদের ভূমিকা থেকে বিশ্ববাসীর নজর সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলির বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলার বদলে পাকিস্তানের উচিত নিজেদের মাটিতে থাকা সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো ভেঙে ফেলা এবং অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধানে মনোনিবেশ করা।

অন্যদিকে, এআরএফ বৈঠকে ভাষণ দিতে গিয়ে ইসহাক দার দাবি করেন, দক্ষিণ এশিয়ার অস্থিরতার মূল কারণ কাশ্মীর সমস্যা। রাষ্ট্রসংঘ সনদ, নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব এবং কাশ্মীরের মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতের বিরুদ্ধে সিন্ধু জলচুক্তিকে ‘জলের অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও তোলেন এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করেন।
এই বৈঠকেই ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির উপর জোর দেন। তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, সন্ত্রাসবাদ কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না এবং প্রতিটি সন্ত্রাসী হামলার উপযুক্ত পরিণতি ভোগ করতেই হবে।
সব মিলিয়ে, আসিয়ানের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলি ফের সামনে চলে এল। কাশ্মীর, সিন্ধু জলচুক্তি এবং সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে দুই দেশের অবস্থান যে এখনও সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে রয়েছে, ম্যানিলার বৈঠকেও তা স্পষ্ট হয়ে উঠল।