প্রচণ্ড রাগ ভিতরে ভিতরে ধ্বংস করছে আপনার অঙ্গ

Spread the love

Health risks of extreme anger: রাগ মানুষের একটি স্বাভাবিক এবং প্রকাশ্য আবেগ। দৈনন্দিন জীবনে নানা জটিলতা, কাজের চাপ কিংবা অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে রাগ হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু আপনি কি মাঝেমধ্যেই প্রচণ্ড রেগে যান? রেগে গেলে কি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে সাবধান হওয়ার সময় এসেছে।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত এবং অনিয়ন্ত্রিত রাগ কেবল সম্পর্কেরই ক্ষতি করে না, বরং এটি আমাদের শরীরের ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। রেগে গেলে শরীরের ভেতরে ঠিক কী কী পরিবর্তন ঘটে এবং তা স্বাস্থ্যের কতটা মারাত্মক ক্ষতি করে, জেনে নিন।

আমরা যখন প্রচণ্ড রেগে যাই, তখন সাময়িকভাবে আমাদের চারপাশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু তার চেয়েও বড় ঝড় বয়ে যায় আমাদের শরীরের ভেতরে। রাগ ওঠার সাথে সাথে আমাদের মস্তিষ্ক শরীরকে একটি ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ (Fight or Flight) মোডে নিয়ে যায়। এর ফলে শরীর এক ধরণের কৃত্রিম জরুরি অবস্থার মুখোমুখি হয় এবং কিছু ক্ষতিকারক হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়।

১. হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি:

প্রচণ্ড রেগে যাওয়ার সাথে সাথে শরীরে ‘অ্যাড্রেনালিন’ (Adrenaline) এবং ‘নর-অ্যাড্রেনালিন’ হরমোনের ক্ষরণ তীব্র বেগে বাড়তে থাকে। এর ফলে হৃদস্পন্দন (Heart Rate) আচমকা অনেক বেড়ে যায় এবং রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার এক লাফে অনেকটাই বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, প্রচণ্ড রাগের পরবর্তী দুই ঘণ্টা একজন মানুষের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ সময়ের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি থাকে। যারা আগে থেকেই হৃদরোগে ভুগছেন, তাঁদের জন্য এই আকস্মিক রাগ প্রাণঘাতী হতে পারে।

২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়া:

আপনি কি জানেন, মাত্র ৫ মিনিটের তীব্র রাগ আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে (Immune System) প্রায় ৬ ঘণ্টার জন্য স্তব্ধ করে দিতে পারে? রেগে গেলে শরীরে ‘কর্টিসল’ (Cortisol) নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যায়। এই হরমোনটি শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। এর ফলে শরীর খুব সহজেই সাধারণ সর্দি-কাশি, ফ্লু কিংবা অন্যান্য ইনফেকশনের শিকার হয়।

৩. ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস:

আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত বা কথায় কথায় রেগে যান, তাঁদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক কম থাকে। রাগের সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অস্বাভাবিক হয়ে যায়, যা ফুসফুসের বায়ুথলিগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে শ্বাসকষ্ট বা ক্রনিক রেসপিরেটরি প্রবলেম দেখা দিতে পারে।

৪. হজম প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ব্যাঘাত:

আমাদের পরিপাকতন্ত্র বা অন্ত্রের সাথে মস্তিষ্কের একটি সরাসরি সংযোগ রয়েছে। রাগের সময় যখন শরীর ‘ফাইট মোড’-এ থাকে, তখন মস্তিষ্ক পাকস্থলী ও অন্ত্রের দিকে রক্ত সঞ্চালন কমিয়ে দেয়। এর ফলে খাবার হজম হওয়ার প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। ফলস্বরূপ তীব্র অ্যাসিডিটি, বুক জ্বালা, গ্যাস, পেট ব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদে ‘ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম’ (IBS)-এর মতো কঠিন পেটের রোগ দেখা দেয়।

৫. অকাল বার্ধক্য এবং অনিদ্রা:

ক্রমাগত রেগে থাকার ফলে মুখের এবং ত্বকের পেশিগুলো সংকুচিত থাকে। কর্টিসল হরমোনের প্রভাবে ত্বকের কোলাজেন নষ্ট হতে শুরু করে, যার ফলে অল্প বয়সেই মুখে বলিরেখা দেখা দেয় এবং অকাল বার্ধক্য গ্রাস করে। এছাড়া, রাগের ফলে স্নায়ুতন্ত্র উত্তেজিত থাকায় রাতে সহজে ঘুম আসতে চায় না, যা অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়ার জন্ম দেয়।

রাগ নিয়ন্ত্রণের সহজ কিছু উপায়:

শরীরকে এই মারাত্মক ক্ষতিগুলোর হাত থেকে বাঁচাতে রাগ নিয়ন্ত্রণ বা ‘অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্ট’ অত্যন্ত জরুরি।

  • রাগ ওঠার সাথে সাথে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে মনে মনে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত গুনুন।
  • দীর্ঘ এবং গভীর শ্বাস (Deep Breathing) নিন, এটি দ্রুত হার্ট রেট স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে।
  • যে বিষয়টি নিয়ে রাগ হচ্ছে, সেই স্থান থেকে সাময়িকভাবে সরে যান এবং এক গ্লাস ঠান্ডা জল খান।

ক্ষণিকের রাগ হয়তো আপনার অহংকারকে শান্ত করতে পারে, কিন্তু তা আপনার অমূল্য শরীরটাকে একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তাই নিজের সুস্থতার খাতিরে, সুন্দর হার্ট ও সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য রাগ ভুলে হাসিখুশি থাকার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *