Parkinson’s Disease Myths and Symptoms: সাধারণত আমাদের চারপাশে যখনই কেউ ‘পারকিনসন্স’ (Parkinson’s Disease) শব্দটা উচ্চারণ করেন, আমাদের চোখে ভেসে ওঠে একজন বয়স্ক মানুষের অবয়ব—যাঁর হাত কাঁপছে বা যিনি খুব ধীরগতিতে হাঁটছেন। এই ধারণাটি সমাজ ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে এতটাই বদ্ধমূল যে, অনেক সময় কমবয়সি রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসাই পান না। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। কলকাতার মণিপাল হাসপাতালের (সল্টলেক) কনসালট্যান্ট নিউরোলজিস্ট ডা. বৈভব শেঠ এই রোগের নানা অজানা ও গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। তুলে ধরলেন পারকিনসন্স পাঁচটি মিথ ও বাস্তব তথ্য। সেইসঙ্গে কী কী করা উচিত, সেই পরামর্শ দিলেন চিকিৎসক।
মিথ ১: পারকিনসন্স শুধু বয়স্কদের হয়
বাস্তব: কম বয়সেও শুরু হতে পারে
যদিও সাধারণত গড় প্রায় ৬০ বছরে এই রোগ ধরা পড়ে, প্রায় পাঁচ থেকে ১০ শতাংশের রোগীর ক্ষেত্রে ৫০ বছরের আগেই উপসর্গ দেখা যায়, যে বিষয়টাকে ইয়াং-অনসেট পারকিনসন্স বলা হয়। আরও বিরল ক্ষেত্রে ২১ বছরের আগেও এই রোগ শুরু হতে পারে- সেটাকে জুভেনাইল পার্কিনসনিজম বলা হয়। কমবয়সি রোগীদের অনেক সময় স্ট্রেস, উদ্বেগ, সার্ভাইক্যাল স্পন্ডাইলোসিস, ফ্রোজেন শোল্ডার বা ডিপ্রেশন হিসেবে ভুল নির্ণয় করা হয়, ফলে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়।
মিথ ২: কাঁপুনি না থাকলে পারকিনসন্স ধরা যায় না
বাস্তব: অনেক রোগীর শুরুতেই কাঁপুনি থাকে না
রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো খুব সামান্য হতে পারে, যেমন দৈনন্দিন কাজে ধীরগতি, হাঁটার সময় হাতের দোল কমে যাওয়া, হাতের লেখা ছোটো হয়ে যাওয়া, কাঁধ বা ঘাড়ে শক্তভাব, মুখের অভিব্যক্তি কমে যাওয়া বা কণ্ঠস্বর নরম হয়ে যাওয়া। কমবয়সিদের ক্ষেত্রে প্রথমে কাঁধে ব্যথা ও শক্তভাব দেখা দিতে পারে, যার কারণে তারা বারবার অর্থোপেডিক চিকিৎসকের কাছে যান, নিউরোলজিস্টের কাছে নয়।

মিথ ৩: পারকিনসন্স শুধু চলাফেরার সমস্যা
বাস্তব: এটি একটি সারা-শরীরের সমস্যা
পারকিনসন্স শুধু নড়াচড়ার সমস্যা তৈরি করে না; এটি শরীরের অন্যান্য দিকেও প্রভাব ফেলে। অনেক সময় চলাফেরার লক্ষণ আসার অনেক আগেই কোষ্ঠকাঠিন্য, গন্ধের অনুভূতি কমে যাওয়া, ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা যায়। এই নন-মোটর লক্ষণগুলো এখন রোগের প্রাথমিক অংশ হিসেবে বিবেচিত।
মিথ ৪: পারকিনসন্স দ্রুত অক্ষম করে দেয়
বাস্তব: সঠিক চিকিৎসায় দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবন সম্ভব
এই রোগ সাধারণত ধীরে-ধীরে বাড়ে এবং সঠিক চিকিৎসা হলে অনেক রোগী দীর্ঘদিন স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন করতে পারেন। নিয়মিত ওষুধ, ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগীরা কাজ, ভ্রমণ এবং দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হন। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে জীবনযাত্রার মান অনেক ভালো রাখা যায়।
মিথ ৫: কমবয়সি ও বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে রোগ একই
বাস্তব: ইয়াং-অনসেট পারকিনসন্স কিছুটা আলাদা
কমবয়সি রোগীরা সাধারণত চিকিৎসায় ভালো সাড়া দেন, রোগের অগ্রগতি ধীর হয় এবং মানসিক সক্ষমতা দীর্ঘদিন বজায় থাকে। তবে তাদের কিছু আলাদা চ্যালেঞ্জ থাকে, যেমন কর্মজীবনে সমস্যা, আর্থিক দায়িত্ব, পরিবার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ এবং সামাজিক মানসিক চাপ।
কেন প্রাথমিক সচেতনতা জরুরি?
এই রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হল দেরিতে শনাক্ত হওয়া। অনেক কমবয়সি মানুষ নিজেরাই ভাবেন না যে তাঁদের পারকিনসন্স হতে পারে। এমনকী অনেক চিকিৎসকও শুরুতে সন্দেহ করেন না। ফলে রোগীরা অনেক দেরিতে বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছান। অথচ প্রাথমিক লক্ষণগুলো আগে থেকেই চিনতে পারলে রোগের গতিপথ অনেকটাই বদলানো সম্ভব।
মূল বার্তা
পারকিনসন্সকে বয়স দিয়ে নয়, সচেতনতা দিয়ে বিচার করতে হবে। রোগের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং রোগীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা খুবই জরুরি। এটি শুধুমাত্র বার্ধক্যের রোগ নয়; এটি এমন একটি অবস্থা, যা দ্রুত শনাক্তকরণ, সঠিক চিকিৎসা এবং সহানুভূতিশীল যত্নের প্রয়োজন।