আমেরিকাগামী দুটি বাণিজ্যিক জাহাজের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে হ্যাকাররা ঢুকে পড়েছিল বলে সন্দেহ করছে আমেরিকার কর্তৃপক্ষ। ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত আগস্টে মেক্সিকো উপসাগরে যাওয়ার পথে দুটি বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজে তল্লাশি চালায় আমেরিকার উপকূলরক্ষী বাহিনী ও তদন্তকারী সংস্থা। দু’টি অভিযানের তারিখ ছিল ২১ এবং ২৪ আগস্ট।
আমেরিকার তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য, দুই জাহাজের কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অননুমোদিত প্রবেশের ইঙ্গিত পাওয়ার পরই যৌথ দল জাহাজগুলিতে ওঠে। উপকূলরক্ষী বাহিনী জানিয়েছে, এর সঙ্গে বিদেশি সাইবার হামলাকারীরা জড়িত থাকতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও ব্যক্তি, সংগঠন বা দেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করা হয়নি। হামলার প্রকৃতি এবং জাহাজগুলির কোন কোন ব্যবস্থা আক্রান্ত হয়েছিল, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
দুটি জাহাজের মধ্যে একটি জাহাজের পরিচয় নিয়ে তথ্য সামনে এসেছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ড্রায়াড গ্লোবালের প্রধান কোরি র্যানসমের দাবি, একটি জাহাজ ছিল লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী ‘ভিএল প্রসপারিটি’। জাহাজটি পরে টেক্সাসের গ্যালভেস্টনের কাছে নোঙর করে। জাহাজটির ওপর এর আগেও সাইবার হামলার অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছিল।
ইরানের সংবাদ সংস্থা ‘মেহর’ গত ২০ আগস্ট দাবি করেছিল, জিব্রাল্টার প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় ‘ভিএল প্রসপারিটি’-র ওপর বড় ধরনের সাইবার হামলা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জাহাজটির যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় ৩০ ঘণ্টার জন্য অচল হয়ে যায়। আরও দাবি করা হয়েছিল, হামলাকারীরা ইঞ্জিন কক্ষের কিছু ব্যবস্থাতেও ঢুকে পড়ে। ইঞ্জিনের ঠান্ডা করার জন্য ব্যবহৃত তরলের প্রবাহ কমিয়ে দেওয়া, ইঞ্জিনের গতি বাড়িয়ে দেওয়া এবং জ্বালানি ও ইঞ্জিন তেলের ট্যাঙ্ক নিয়ন্ত্রণে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিল বলে অভিযোগ করা হয়। তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে সম্পূর্ণ যাচাই এখনও হয়নি।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হল, আধুনিক জাহাজে শুধু যোগাযোগ নয়, ইঞ্জিন, নেভিগেশন, জ্বালানি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা কম্পিউটার ও নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে হ্যাকাররা যদি এই ব্যবস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণে ঢুকে পড়তে পারে, তা হলে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ কোরি র্যানসম সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের হামলা আরও বাড়তে পারে।

ঘটনাটির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, একই সময়ে আমেরিকা ইরান-সংক্রান্ত একাধিক সাইবার ঘটনার তদন্ত করছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কয়েকটি হামলার সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য যোগসূত্রের কথা বলা হলেও, আমেরিকার কর্তৃপক্ষ এই দুই জাহাজের ঘটনায় ইরানকে দায়ী করেনি। উপকূলরক্ষী বাহিনী শুধু ‘বিদেশি সাইবার হামলাকারী’-র কথা বলেছে। ফলে হামলার নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ঘটনায় এখনও পর্যন্ত জাহাজের কর্মীদের নিরাপত্তা বা সামুদ্রিক পরিবেশের ক্ষতির কোনও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে আমেরিকার কর্তৃপক্ষের এই হস্তক্ষেপ দেখিয়ে দিচ্ছে, বাণিজ্যিক জাহাজে সাইবার হামলা এখন আর শুধুমাত্র কম্পিউটার ব্যবস্থার সমস্যা নয়; তা সরাসরি সমুদ্রপথের নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনে জাহাজের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কতটা সুরক্ষিত রাখা যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।