১৯৬৩ সালের ২৭ জানুয়ারি। দিল্লির ন্যাশনাল স্টেডিয়াম সাক্ষী ছিল এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তের। ভারত-চীন যুদ্ধের শহীদদের স্মরণে লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া ‘অ্যায় মেরে ওয়াতন কে লোগোঁ’ শুনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর চোখের জল বাঁধ মানেনি। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক দশক পর এই গানের নেপথ্য কাহিনী ফাঁস করেছিলেন খোদ সুরকার সি. রামচন্দ্র এবং গীতিকার প্রদীপ। তাঁরা জানান, এই গানটি লতা মঙ্গেশকরের জন্য নয়, বরং আশা ভোঁসলের জন্যই তৈরি হয়েছিল।
কেন আশাকে বাদ দেওয়া হয়েছিল?
শুরুতে সুরকার সি. রামচন্দ্র গানটির মহড়া বা রিহার্সাল আশা ভোঁসলের সাথেই শুরু করেছিলেন। এমনকি গানের মিউজিক ট্র্যাকও আশার স্কেল অনুযায়ী তৈরি করা হয়। কিন্তু সেই সময়ে লতা মঙ্গেশকর এবং সি. রামচন্দ্রের মধ্যে এক মনমালিন্য চলছিল, যার কারণে লতা এই প্রজেক্টে ছিলেন না।
গল্পে মোড় আসে তখন, যখন গীতিকার প্রদীপ জেদ ধরেন যে এই গানটি লতার কণ্ঠ ছাড়া পূর্ণতা পাবে না। তিনি বিশ্বাস করতেন, বীর রসের এই গম্ভীর আবেগ লতা মঙ্গেশকরের গায়কিতেই সবচেয়ে ভালো ফুটে উঠবে।
লতার প্রবেশ এবং ‘রিফিউজাল’
প্রদীপ যখন লতার কাছে প্রস্তাব নিয়ে যান, লতা প্রথমে রাজি হননি। তাঁর এবং সি. রামচন্দ্রের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত তিক্ততা তখন তুঙ্গে। প্রদীপ হাল না ছেড়ে লতাকে রাজি করান। এদিকে আশা ভোঁসলে যখন জানতে পারেন যে দিদি এই গানটি গাইতে চলেছেন, তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। যদিও শোনা যায়, প্রথমে দুই বোনের ডুয়েট গাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু লতা একা গাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করায় আশা নিজেকে সরিয়ে নেন।

দিল্লির সেই ঐতিহাসিক রাত
গানটি তৈরি হওয়ার পর যখন লতা এটি দিল্লিতে পারফর্ম করেন, তখন গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। নেহরুজি লতার কাছে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বেটি, আজ তুমনে মুঝে রুলা দিয়া।’ কিন্তু মজার বিষয় হলো, সেই অনুষ্ঠানে লতা এবং সি. রামচন্দ্র একে অপরের সাথে কথাই বলেননি! এমনকি মহড়াও আলাদা আলাদা ভাবে হয়েছিল।
বিতর্ক ও আক্ষেপ
পরবর্তীকালে আশা ভোঁসলে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, এই গানটি হাতছাড়া হওয়া তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম আক্ষেপের বিষয় ছিল। তবে লতার সেই গায়কী গানটিকে যে উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে, তা হয়তো আর কারোর পক্ষেই সম্ভব হতো না।
আশা ভোঁসলে ভারতীয় জাতীয় সম্পদ। ৯৩ বছর বয়সী গায়িকা অসুস্থ। বুকে সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি মুম্বইয়ের বেসরকারি হাসপাতালে। চলছে চিকিৎসা। তাঁর আরোগ্য কামনা করছে গোটা দেশ। ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আশা ভোঁসলে। দিদির পদাঙ্ক অনুসরণ করে হিন্দি ছবির দুনিয়ায় আগমন। ১৯৪৮ ‘চুনারিয়া’ দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। তিনি গত 7 দশক ধরে এই শিল্পে সক্রিয় রয়েছেন। আশা তার কর্মজীবনে হিন্দি, মারাঠি, ইংরেজি এবং অন্যান্য ভাষায় হাজার হাজার গান গেয়েছেন। তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (২০০০) এবং পদ্মবিভূষণ (২০০৮) এ ভূষিত হয়েছেন।