US-Israel: সুইজারল্যান্ডে সদ্য সমাপ্ত আলোচনা এবং অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তির আবহেই এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক অস্বস্তি সামনে আসছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা ইজরায়েল এবার ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সূত্রের খবর, তেল আভিভের আশঙ্কা হোয়াইট হাউসের বর্তমান পদক্ষেপগুলো লেবাননে ইরানের হাতকেই আরও শক্তিশালী করে তুলছে। ইতিমধ্যে লেবাননের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলো থেকে ইজরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে; যেখানে ওয়াশিংটন সরাসরি তেহরানের সঙ্গে টেবিলে বসে আলোচনা চালাচ্ছে, আর লেবানন সীমান্ত নিয়ে চরম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে মাঝপথে কার্যত একা হয়ে পড়েছে তেল আভিভ। গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারকে লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই চুক্তির খসড়ার একেবারে প্রথম দফায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান এবং বর্তমান যুদ্ধে তাদের সমস্ত মিত্র দেশগুলো লেবানন-সহ সমস্ত ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের ঘোষণা করতে এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করছে। আজ থেকে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনও যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু না করার অঙ্গীকার করছে; সেই সঙ্গে একে অপরকে বলপ্রয়োগ বা শক্তি প্রদর্শনের হুমকি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে এবং লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা নিশ্চিত করবে।’ গত সোমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারককে কার্যত কোনও আমলই দেননি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নিজের দেশের নাগরিকদের সুরক্ষার স্বার্থে যতদিন প্রয়োজন, ঠিক ততদিনই ইজরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে মোতায়েন থাকবে।
অন্যদিকে, মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রযুক্তিগত বা টেকনিক্যাল স্তরের আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার পর এক নতুন গুঞ্জন সামনে আসছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ দুজন ইজরায়েলি সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, নেতানিয়াহু সরকার এখন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ লেবাননে ইরানের প্রভাব ও কর্তৃত্বকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তেল আভিভের আশঙ্কা, এর ফলে ওই অঞ্চলে ইজরায়েলের স্বাধীনভাবে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষমতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত বা খর্ব হতে পারে।

‘হিস্টেরিকাল হয়ে পড়েছেন বিবি’
তেহরানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বোঝাপড়া লেবাননে সক্রিয় ইরানি প্রক্সি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর শক্তিকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ প্রচেষ্টাকে কার্যত ভেস্তে দিতে পারে-এমনটাই আশঙ্কা করছেন ইজরায়েলি কর্মকর্তারা। তাঁদের আরও বড় উদ্বেগ হলো, এখন থেকে ইজরায়েল লেবাননে কোনও বিমান হামলা বা সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করলেই ওয়াশিংটন তাতে আপত্তি তুলতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের জন্য ট্রাম্পের পক্ষ থেকে তীব্র চাপ আসতে পারে বলেও তাঁরা মনে করছেন। সূত্রের দাবি, লেবানন ইস্যুতে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই সাম্প্রতিক চুক্তিটি মূলত ২০২৪ সালে জো বাইডেন প্রশাসন এবং নেতানিয়াহু সরকারের মধ্যে হওয়া দ্বিপাক্ষিক সমঝোতাকে সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করেছে; যে চুক্তিটিকে ২০২৫ সালে ক্ষমতায় আসার আগে ট্রাম্পের নতুন সরকারও সবুজ সংকেত দিয়েছিল।
জানা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির চেয়েও লেবানন প্রসঙ্গটি নিয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর একটি প্রতিবেদনে এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘এই চুক্তি নিয়ে বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) আক্ষরিক অর্থেই হিস্টেরিকাল বা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।’ পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে নেতানিয়াহু তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহযোগী, প্রাক্তন মন্ত্রী রন ডারমারকে জরুরি ভিত্তিতে ট্রাম্পের শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে ট্রাম্পের টিমের ভেতরের প্রভাব খাটিয়ে লেবানন সংক্রান্ত মার্কিন-ইরান আলোচনাকে ইজরায়েলের অনুকূলে ঘোরানো যায়। রিপোর্ট অনুযায়ী, হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণ না করলে ইরানকে চরম মূল্য চোকাতে হবে বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ যে কড়া পোস্টটি করেছিলেন, তা মূলত রন ডারমারের এই পর্দার পিছনের তৎপরতার কারণেই সম্ভব হয়েছিল।