পাকিস্তানের মদতে পশ্চিমবঙ্গে বড় ধরনের নাশকতার ছক কষা হচ্ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে বিস্ফোরক তথ্য। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ধৃত জঙ্গি নেতা হামিম মণ্ডলকে ব্যবহার করে পুলিশ আধিকারিকদের উপর সরাসরি সশস্ত্র হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। শুধু তাই নয়, রাজ্যের কয়েকজন মন্ত্রী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হানিট্র্যাপে ফেলার চেষ্টাও চলছিল বলে গোয়েন্দাদের হাতে তথ্য এসেছে। এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি।
তদন্তে জানা গিয়েছে, পাকিস্তানে বসে থাকা জঙ্গি শেহজাদ ভাট্টি এই পুরো পরিকল্পনার অন্যতম মূলচক্রী। তাঁর নির্দেশেই হামিম মণ্ডল কাজ করছিল বলে অভিযোগ। গোয়েন্দারা এখন খতিয়ে দেখছেন, স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে কোনও হামলার পরিকল্পনা ছিল কি না। কারণ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলিতে নাশকতার আশঙ্কা বরাবরই বেশি থাকে।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, হামিম মণ্ডল শুধু শেহজাদ ভাট্টি গ্যাংয়ের হয়ে কাজ করছিল না, সে তেহরিক-ই-তালিবান হিন্দুস্থান (টিটিএইচ)-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিল। এই জঙ্গি সংগঠন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে পাঞ্জাবে একাধিক পুলিশ আধিকারিককে খুন করেছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। সেই একই কায়দায় এবার পশ্চিমবঙ্গেও পুলিশ অফিসারদের টার্গেট করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কয়েকজন পুলিশকর্তার উপর নজরদারিও শুরু হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই নাশকতার জন্য বিপুল অর্থ খরচ করছিল। গোয়েন্দাদের দাবি, দেশবিরোধী পোস্টার লাগানোর মতো ছোট কাজের জন্যও একজনকে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা দেওয়া হতো। আবার বড় ধরনের হামলার জন্য তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কীভাবে অস্ত্র জোগাড় করতে হবে, কোথায় হামলা চালাতে হবে এবং কীভাবে পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সেই সংক্রান্ত নির্দেশ পাকিস্তান থেকে সামাজিক মাধ্যমে পাঠানো হতো।
তদন্তে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে তথ্য সামনে এসেছে, তা হল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উপর হামলার ছক। গোয়েন্দাদের দাবি, সম্ভাব্য হামলার রুট, পদ্ধতি এবং নিরাপত্তার ফাঁকফোকর নিয়ে একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। সেই খসড়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে পাকিস্তানে থাকা হ্যান্ডলারদের কাছে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তা খতিয়ে দেখে সম্ভাব্য রুট ও পরামর্শও পাঠানো হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। ওই রুটে আগে থেকে কেউ গিয়ে নজরদারি বা রেকি করেছিল কি না, তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হামিমের মোবাইল ফোন থেকে এই সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য মিলেছে বলে জানা গিয়েছে।

এদিকে তদন্তে আরও উঠে এসেছে, রাজ্যের অন্তত ছয়জন মন্ত্রী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হানিট্র্যাপে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল হামিম মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ পরিচিত অর্পিতা সরকারকে। গোয়েন্দাদের সন্দেহ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ বা ব্ল্যাকমেল করার পরিকল্পনাই ছিল জঙ্গিদের উদ্দেশ্য।
গোয়েন্দারা আরও জানতে পেরেছেন, হামিম একা কাজ করছিল না। পাকিস্তানের হ্যান্ডলার রানা, উজায়ের, আবিদ জাঠ এবং হামার নামে কয়েকজনের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাঁদের নির্দেশে আরও কয়েকজনকে সামাজিক মাধ্যমে যুক্ত করা হয়েছিল। আলাদা আলাদাভাবে বিভিন্ন ধরনের নাশকতার পরিকল্পনাও চলছিল বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
ইতিমধ্যেই অসম, রাজস্থান, দিল্লি এবং উত্তরপ্রদেশ থেকে এই জঙ্গি চক্রের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গেও টিটিএইচ-এর একাধিক মডিউল তৈরি করার পরিকল্পনা ছিল। সেই উদ্দেশ্যে হামিম বিভিন্ন জায়গায় গোপন বৈঠকও করেছিল বলে অভিযোগ। অস্ত্র সংগ্রহ, অর্থের জোগান এবং নাশকতার জন্য কিছু দুষ্কৃতীকেও কাজে লাগানোর চেষ্টা চলছিল। পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় স্লিপার সেল গড়ে তোলার চেষ্টারও প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত এখনও চলছে। হামিম মণ্ডলের মোবাইল, সামাজিক মাধ্যমের যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা। তাঁদের আশা, এই তদন্তে জঙ্গি চক্রের আরও সদস্য এবং তাদের নাশকতার পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসবে।