বর্ষায় মাছ কিনছেন? সাবধান! এই ৫ মাছে লুকিয়ে রয়েছে বিষ! বিকল হতে পারে হার্ট ও কিডনি

Spread the love

Mercury contamination in fish heart health: আষাঢ়-শ্রাবণ মানেই বাঙালির পাতে ইলিশের আনাগোনা। বর্ষাকালের ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর দুপুরে গরম ভাতের সাথে মাছের ঝোল বা ভাজা—বাঙালির পরম তৃপ্তি। কিন্তু মাছ ভালোবাসলেও এই বর্ষার মরশুমে মাছ কেনার সময় আমাদের অত্যন্ত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। বর্ষাকালে জল দূষণ এবং মাছের প্রজনন ঋতু হওয়ার কারণে বাজারে এমন কিছু মাছ পাওয়া যায়, যা আমাদের অজান্তেই শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

বিশেষ করে ৫টি নির্দিষ্ট ধরনের মাছ এই সময়ে খেলে তার মধ্যে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক ও টক্সিন (Toxins) সরাসরি আমাদের কিডনি (Kidney) এবং হার্ট বা হৃদযন্ত্রের (Heart) বড় ধরণের ক্ষতি করতে পারে। বর্ষায় সুস্থ থাকতে কোন কোন মাছ এড়িয়ে চলবেন এবং কেন, তা জেনে নিন।

মাছ প্রোটিন এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের চমৎকার উৎস হলেও বর্ষাকালে নদী, পুকুর বা সমুদ্রের জলের পরিবেশ অনেকটাই বদলে যায়। বৃষ্টির জলে ধুয়ে আসা নোংরা, কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য এবং ভারী ধাতু জলের তলায় জমা হয়। এই সময়ে কিছু নির্দিষ্ট মাছ খাওয়া কেন বিপজ্জনক, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত বড় মাছ (মার্কারি বা পারদের আতঙ্ক)

সমুদ্রের কিছু বড় এবং চর্বিযুক্ত মাছ, যেমন— টুনা (Tuna), কিং ম্যাকেরেল (King Mackerel) বা হাঙর জাতীয় মাছ বর্ষাকালে এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই ধরনের বড় মাছগুলো জলের তলায় থাকা ছোট ছোট মাছ এবং বর্জ্য খায়। ফলে এদের শরীরে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রায় ‘মিথাইল-মার্কারি’ (Methylmercury) বা পারদ জমা হয়। বর্ষার দূষিত জলের কারণে এই পারদের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এই বিষাক্ত ধাতু আমাদের শরীরে প্রবেশ করলে তা রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে এবং কিডনির ছাঁকন ক্ষমতা বা নেফ্রনগুলোকে স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিতে পারে।

২. কৃত্রিমভাবে চাষ করা থাই পাঙ্গাশ বা মাগুর (Farmed Fish)

আজকাল বাজারে সস্তায় প্রচুর পাঙ্গাশ বা আফ্রিকান মাগুর মাছ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, নোংরা এবং ছোট বদ্ধ পুকুরে কৃত্রিম উপায়ে চাষ করা এই মাছগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য অ্যান্টিবায়োটিক এবং বিভিন্ন হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়। বর্ষার সময় এই নোংরা জলের ব্যাকটেরিয়া ও রাসায়নিকের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায়। এই অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত মাছ নিয়মিত খেলে মানুষের শরীরে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’ তৈরি হয় এবং লিভার ও কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা পরবর্তীকালে কিডনি বিকল বা রেনাল ফেইলিওরের কারণ হতে পারে।

৩. নোংরা জলের তলার মাছ বা ক্যাটফিশ (Bottom Feeders)

যে সমস্ত মাছ জলাশয়ের একদম নিচে বা কাদার মধ্যে থাকে, যেমন— বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাটফিশ বা বোয়াল, শোল জাতীয় বড় মাছ, তারা জলের নিচের সমস্ত ক্ষতিকর উপাদান ও ভারী ধাতু (যেমন লেড বা সিসা এবং ক্যাডমিয়াম) নিজেদের শরীরে শোষণ করে নেয়। বর্ষার শুরুতে যখন চারপাশের ময়লা জল পুকুর বা নদীতে মেশে, তখন এই বটম-ফিডার বা তলার মাছগুলোর শরীর বিষাক্ত কেমিক্যালের ডিপো হয়ে ওঠে। এগুলো নিয়মিত খেলে হৃদপিণ্ডের ধমনীতে ব্লকেজ তৈরি হতে পারে।

৪. আমদানি করা হিমায়িত বা ফ্রোজেন মাছ (Frozen Fish)

বর্ষাকালে অনেক সময় সমুদ্রে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। ফলে বাজারে দূর-দূরান্ত থেকে আসা হিমায়িত বা ফ্রোজেন মাছের সরবরাহ বাড়ে। এই মাছগুলোকে মাসের পর মাস তাজা ও চকচকে দেখাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা ‘ফরমালিন’ (Formalin) এবং অতিরিক্ত সোডিয়ামযুক্ত প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করেন। ফরমালিন সরাসরি আমাদের লিভার ও কিডনিকে ধ্বংস করে এবং রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৫. বর্ষাকালীন শেলফিশ বা কাঁকড়া ও চিংড়ি

চিংড়ি, কাঁকড়া বা ঝিনুক জাতীয় জলজ প্রাণী (Shellfish) জলের ফিল্টার হিসেবে কাজ করে। এরা জলের সমস্ত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল এবং টক্সিন নিজেদের ফুলকার সাহায্যে ছেঁকে নেয়। বর্ষাকালে জলে ‘অ্যালগাল ব্লুম’ বা বিষাক্ত শ্যাওলা বেশি জন্মায়। এই সময়ে চিংড়ি বা কাঁকড়া খেলে তীব্র ফুড পয়জনিং, পেটের রোগ ছাড়াও টক্সিনের কারণে হৃদযন্ত্রের পেশি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

বর্ষায় মাছ খাওয়ার নিরাপদ টিপস:

  • সবসময় স্থানীয় ছোট পুকুর বা জীবন্ত নদীর তাজা ছোট মাছ (যেমন চুনো মাছ, মৌরলা, বা পোনা মাছ) খাওয়ার চেষ্টা করুন।
  • মাছ কেনার সময় তার ফুলকা লাল এবং চোখ উজ্জ্বল আছে কি না দেখে নিন। নরম বা গন্ধযুক্ত মাছ একদম কিনবেন না।
  • রান্নার আগে মাছ ভালো করে হালকা গরম নুন জলে অন্তত ১৫ মিনিট ভিজিয়ে ধুয়ে নিন, এতে ব্যাকটেরিয়া ও বাইরের রাসায়নিক অনেকটাই দূর হয়।

খাদ্যতালিকায় মাছ রাখা স্বাস্থ্যের জন্য অবশ্যই ভালো, তবে তা যেন উল্টে রোগ ডেকে না আনে। বর্তমান ২০২৬ সালের এই সচেতনতার যুগে নিজের এবং পরিবারের হার্ট ও কিডনিকে সুরক্ষিত রাখতে বাজার করার সময় একটু চোখ-কান খোলা রাখুন। বর্ষার এই কয়েকটা মাস মাছ কেনার ক্ষেত্রে আপস না করাই শ্রেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *