ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক স্পর্শ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ৪,৩৯৯ দিনের অবিচ্ছিন্ন প্রধানমন্ত্রিত্বের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর ৪,৩৯৮ দিনের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেন। এই অর্জন শুধু সংখ্যার নয়, বরং এক সাধারণ মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও জনসেবার অক্লান্ত যাত্রার প্রতীক। আর এই বিশেষ দিনে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ বলেছেন, ভারতের ইতিহাসে ২০২৬-এর ১০ জুন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলাল নেহরুর রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেলেন। ঐতিহাসিক দিক থেকে নরেন্দ্র মোদীর সময়কাল নেহরুর থেকে বেশি, কিন্তু ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিরিখেও এই সময়কাল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কোবিন্দ লিখেছেন, ২০১৪ সালের ২৬ মে থেকে ভারতের রাজনৈতিক যাত্রাপথ মহাত্মা গান্ধী, সর্দার প্যাটেল, বাবাসাহেব আম্বেদকর, রাজেন্দ্র প্রসাদ, সি রাজাগোপালাচারী, কে এম মুন্সির মতো আধুনিক ভারতের স্থপতিরা ‘ভারতীয়ত্ব’ নিয়ে যে স্বপ্ন দেখতেন, নরেন্দ্র মোদী সরকারের নীতির যথেষ্ট মিল রয়েছে। আর্থিক উন্নয়নের জন্য মোদী ‘রাজাজি মডেল’–কে অনুসরণ করেছেন। তিনি বলেন, রাজাজি নেহরুবাদী অর্থনীতির ‘কোটা, পারমিট ও লাইসেন্স রাজ’-এর কড়া সমালোচক ছিলেন। ১৯৪৯-এ ২৫ নভেম্বর আম্বেদকর গণ-পরিষদের সমাপ্তি ভাষণে বলেছিলেন, ‘আড়াই হাজার বছর আগে বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলিতে সংসদীয় গণতন্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। অথচ, দেশের যুবা এবং বিশিষ্টরা মনে করেন আমাদের নিজস্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা পশ্চিমা বিশ্ব থেকে অানা হয়েছে।’ মোদীও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বলেন, ‘ভারত হলো গণতন্ত্রের জননী। যা সব থেকে প্রাচীন, বৃহৎ এবং প্রাণবন্ত।’
প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির দাবি, প্রাচীন ভারতীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক চর্চার ঐতিহ্য ছিল, যা দীর্ঘদিন যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে ভারতের ভোটার সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটির কাছাকাছি, যা স্বাধীনতার সময় দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় তিনগুণ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৭৪৪টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে, যেখানে ১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল মাত্র ৫৩টি দল। রামনাথ কোবিন্দের কথায়, ‘জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের প্রতি নজরদারি নেহরুর সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। এত উচ্চ প্রত্যাশার মধ্যেও মানুষের আস্থা বজায় রাখা মোদীর একটি ব্যতিক্রমী সাফল্য।’ তিনি আরও দাবি করেন, একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ তুলনামূলকভাবে কম হলেও মোদী সেই বৈশ্বিক প্রবণতার ব্যতিক্রম। তাঁর কথায়, ‘ঔপনিবেশিক শাসকরা হীনমন্যতার যে মনোভাব আমাদের মধ্যে গেঁথে দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার অনেক পরেও সেই ভাবনা মানুষের মনের মধ্যে ছিল। এর ফলে ক্ষুদ্র অভিজাত গোষ্ঠী তৈরি হয়। সেই গোষ্ঠীর ধারণা টমাস ব্যাবিংটন মেকলের থেকে এসেছিল। যার ফলে স্বাধীনতার পরে দশকের পর দশক ধরে ইংরেজিকে ক্ষমতার ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা চেষ্টা চলেছে। নেহরুর বা তার পরবর্তী সময়েও এই অভিজাত শ্রেণি ভারতীয় বিভিন্ন বিষয়গুলিকে অপছন্দ করতেন। কিন্তু মোদী ভারতীয় ভাষা, প্রতীক এবং প্রাচীন ভারতীয় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জোরদার প্রচার চালানোয় এখন দেশবাসীর মধ্যে ভারতীয়ত্ব গর্ববোধ করেন।’

নিবন্ধের শেষাংশে রামনাথ কোবিন্দ বলেন, স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক দশকের ভারতের সঙ্গে গত ১২ বছরের ভারতের একটি স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তাঁর মতে, নেহরু যুগে পশ্চিমা বিশ্বের স্বীকৃতি ও সমর্থন পাওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল, আর মোদী যুগে আত্মনির্ভর অর্থনীতি ও ভারতীয় সংস্কৃতি, ভাষা এবং মূল্যবোধের প্রতি আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি দৃশ্যমান। তিনি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন। এক কিশোর আত্মীয় তাঁকে বলেছিল, ‘আপনি নেহরুর ভারতে বড় হয়েছেন, আর আমি মোদীর ভারতে বড় হচ্ছি।’ রামনাথ কোবিন্দের দাবি, ওই কিশোর মনে করে তার প্রজন্ম এ কারণে আরও বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।