রাজ্যের আধিকারিকদের বদলি মামলায় হস্তক্ষেপই করল না সুপ্রিম কোর্ট

Spread the love

: রাজ্যের মুখ্যসচিব থেকে শুরু করে বিডিও, ওসি- এক লপ্তে কয়েকশো আধিকারিককে সরানোর যে ‘নজিরবিহীন’ সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশন নিয়েছিল, তাকেই মান্যতা দিল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল, আসন্ন নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে কমিশনের এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তারা এখনই হস্তক্ষেপ করতে আগ্রহী নয়। তবে আইনি বিষয়ের খাতিরে মামলাটি বিচারাধীন রাখা হয়েছে।

প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ

বৃহস্পতিবার শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। তিনি বলেন, অফিসারদের বদলির ঘটনা সর্বত্রই ঘটে, এটা প্রথম বার নয়। তাঁর কথায়, ‘সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ হল আদালতকে বিচারকদের নিয়োগ করতে হয়েছে। কারণ, আস্থার ঘাটতি দুই পক্ষের মধ্যেই রয়েছে। কমিশনের যেমন রাজ্য প্রশাসনের ওপর আস্থা নেই, তেমনই রাজ্যেরও কমিশনের ওপর পূর্ণ ভরসা নেই। এই আস্থার ঘাটতির কারণেই অনেক সময় আদালতকেও হস্তক্ষেপ করতে হয়।’ রাজ্য যে ১,১০০ জন অফিসারের বদলি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, তার প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতির পাল্টা প্রশ্ন, যাঁদের বদলি করা হয়েছে তাঁরা তো পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারেরই অফিসার, তবে পক্ষপাতের অভিযোগ কেন? তাঁর পর্যবেক্ষণ, নির্বাচনের আগে কিছুটা হলেও নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আরও জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিষয়টি দেখা উচিত নয়। বাইরের রাজ্যের পর্যবেক্ষক অনেক সময় নিরপেক্ষতার দিক থেকে আদর্শ হতে পারেন। আদালত একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিষয়টি দেখছে। কিন্তু যদি আগামী দিনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে কমিশনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়, আর তখন বলা হয় যে, তা আইনে স্পষ্ট ভাবে লেখা নেই- তা হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, আইনে রিটার্নিং অফিসার বা রাজ্যের নির্দিষ্ট আধিকারিকদের ভূমিকা আলাদা করে রয়েছে। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে সেই বাধ্যবাধকতা একই ভাবে নেই।কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সওয়াল

তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সওয়াল করে জানান, বদলির আগে রাজ্যের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন ছিল। অতীতে উপনির্বাচনের সময়ও রাজ্যের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছিল। কিন্তু এবার কোনও আলোচনা ছাড়াই নজিরবিহীন ভাবে মুখ্যসচিবকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কল্যাণের দাবি, মুখ্যসচিব কিছু প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন বলেই তাঁকে সরানো হয়েছে। কেবল ‘মতভেদ’ কী বদলির কারণ হতে পারে? এর জবাবে প্রধান বিচারপতি জানান, যদি বাইরের রাজ্য থেকে অফিসার এনে বসানো হতো, তা হলে আদালতের ওই পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপের প্রশ্ন উঠতে পারে।

কলকাতা হাইকোর্টের পদাঙ্ক অনুসরণ

ভোটের মুখে রাজ্যে মুখ্যসচিব থেকে পুলিশকর্তা, প্রশাসনিক আধিকারিকদের রদবদলের প্রতিবাদে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছিল শাসকদল তৃণমূল। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের বেঞ্চও এই মামলা খারিজ করে দিয়েছিল। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল, আধিকারিক বা সরকারি কর্মীদের অল্প সময়ের জন্য পূর্ব দায়িত্ব বা কর্মস্থল থেকে সরানো হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের উপর কোনও বাধ্যবাধকতা নেই যে, তারা প্রতিটি বদলির কারণ ব্যাখ্যা করবে। তাই এই ধরনের বদলি বা অপসারণকে সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন করার প্রেক্ষিতেই বুঝতে হবে। উচ্চ আদালত আরও জানায়, আধিকারিকদের বদলি একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তাতে সাধারণত হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ করে না। যদি কমিশন ক্ষমতার বাইরে গিয়ে স্পষ্ট ভাবে বেআইনি কোনও কাজ করে, তবেই হস্তক্ষেপ করা যেত। কলকাতা হাইকোর্টের সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল রাজ্য। সুপ্রিম কোর্টও এদিন কার্যত হাইকোর্টের সেই নির্দেশকেই বহাল রাখল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *