আজকের দিনে ভারতে কোনো নাগরিকের পরিচয়পত্র হিসেবে আধার কার্ডের গুরুত্ব অপরিসীম। সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প থেকে শুরু করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা, নতুন সিম কার্ড নেওয়া কিংবা আয়কর রিটার্ন ফাইল—সব ক্ষেত্রে ১২ সংখ্যার আধার নম্বর অপরিহার্য। তবে অনেক সময় ভুল তথ্য সংশোধন, জালিয়াতি প্রতিরোধ বা ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা সুরক্ষার স্বার্থে অনেকের মনেই একটি বড় প্রশ্ন জাগে—একবার আধার নম্বর তৈরি হয়ে গেলে সেটি কি সম্পূর্ণ বাতিল বা মুছে ফেলা (Delete) সম্ভব?
সম্প্রতি ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বা ইউআইডিএআই (UIDAI)-এর প্রকাশিত নির্দেশিকা এবং এই সংক্রান্ত নিয়মে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা হয়েছে। আধার নম্বর মোছা বা নিষ্ক্রিয় করার নিয়মাবলি এবং বর্তমান আইনি পরিকাঠামো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. সাধারণভাবে কি আধার নম্বর মোছা সম্ভব?
আইনি ও প্রযুক্তিগতভাবে আধার আইন ২০১৬ (Aadhaar Act, 2016) অনুযায়ী, কোনো ভারতীয় নাগরিক স্বউদ্যোগে বা ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর আধার নম্বর চিরতরে সিস্টেম থেকে মুছে ফেলতে বা বাতিল করতে পারেন না।
- আজীবন স্থায়ী পরিচয়পত্র: আধার কোনো সাধারণ পরিচয়পত্র নয়, এটি একটি অনন্য বায়োমেট্রিক ও ডেমোগ্রাফিক ডেটাবেস। একবার কোনো ব্যক্তির বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও আইরিস স্ক্যান) সিস্টেমে নিবন্ধিত হলে, সেই ১২ সংখ্যার নম্বরটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাথে আজীবন যুক্ত থাকে।
- শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যতিক্রম: আধার আইনের ৩এ (Section 3A) ধারায় একটি মাত্র ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। পাঁচ বছর বয়সের নিচে যেসব শিশুর ‘বাল আধার’ (Baal Aadhaar) তৈরি করা হয়, তারা ১৮ বছর বয়স পূর্ণ করার পর ছয় মাসের মধ্যে আধার নম্বর বাতিল করার আবেদন জানাতে পারে। এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আবেদন করলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাদের আধার তথ্য সিস্টেম থেকে নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব।
২. কোন কোন পরিস্থিতিতে ইউআইডিএআই আধার ডিঅ্যাক্টিভেট করে?
কোনো নাগরিক নিজে থেকে আধার মুছে ফেলতে না পারলেও, ইউআইডিএআই নির্দিষ্ট কিছু আইনি ও প্রযুক্তিগত কারণে আধার নম্বর নিষ্ক্রিয় (Deactivate) বা সংকুচিত করতে পারে:
ভুয়া বা দ্বৈত আধার (Duplicate Aadhaar): যদি কোনো ব্যক্তির নামে দুবার আধার তৈরি হয়ে থাকে কিংবা ভুল তথ্য দিয়ে ভুয়া নথি তৈরি করা হয়, তবে তদন্ত সাপেক্ষে দ্বিতীয় বা জাল আধারটি ইউআইডিএআই অবিলম্বে বাতিল করে।
- বায়োমেট্রিক তথ্যের অমিল বা জালিয়াতি: বায়োমেট্রিক তথ্য আপডেটে দীর্ঘদিনের গাফিলতি বা কোনো অসদুপায় অবলম্বন ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট কার্ডটি ডিঅ্যাক্টিভেট করা হতে পারে।
- ১০ বছর পর তথ্য আপডেট না করা: ইউআইডিএআই-এর নিয়ম অনুযায়ী, আধার নেওয়ার ১০ বছর পর প্রমাণের নথি (PoI ও PoA) পুনরায় আপডেট করা বাধ্যতামূলক। দীর্ঘকাল তথ্য আপডেট না করলে নিরাপত্তা স্বার্থে সেটি সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় হতে পারে।
- মৃত ব্যক্তিদের আধার নিষ্ক্রিয়করণ: মৃত ব্যক্তির আধার নম্বরের সম্ভাব্য অপব্যবহার ও জালিয়াতি রোধ করতে ইউআইডিএআই রাজ্য সরকারের জন্ম-মৃত্যু রেজিস্ট্রি ডেটাবেসের সাথে আধার যুক্ত করে কোটির বেশি মৃত ব্যক্তির আধার নিষ্ক্রিয় করার কাজ জোরকদমে চালাচ্ছে।

৩. ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় আধার বাতিলের বিকল্প সুবিধা
যদি তথ্যের গোপনীয়তা বা জালিয়াতি নিয়ে আপনার মনে সংশয় থাকে, তবে আধার নম্বর না মুছেও ইউআইডিএআই-এর দেওয়া উন্নত নিরাপত্তা বলয় ব্যবহার করতে পারেন:
- মাস্কড আধার (Masked Aadhaar): যেকোনো জায়গায় প্রমাণের জন্য পুরো আধার নম্বর প্রকাশের বদলে ‘মাস্কড আধার’ ব্যবহার করা নিরাপদ। এতে প্রথম ৮টি সংখ্যা গোপন থাকে (যেমন: xxxx-xxxx-1234) এবং কেবল শেষ ৪টি সংখ্যা দেখা যায়, যা আইনিভাবে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য।
- ভার্চুয়াল আইডি (VID): ১২ সংখ্যার মূল আধার নম্বরের বদলে ১৬ সংখ্যার সাময়িক ভার্চুয়াল আইডি তৈরি করে ই-কেওয়াইসি সম্পন্ন করা যায়।
- বায়োমেট্রিক লক (Biometric Lock): ইউআইডিএআই-এর ওয়েবসাইট বা ‘mAadhaar’ অ্যাপের মাধ্যমে আপনার ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও আইরিস স্ক্যান লক করে রাখা সম্ভব, যাতে আপনার অনুমতি ছাড়া কেউ জালিয়াতি করতে না পারে।
আধার কার্ড ভারতের কেন্দ্রীয় ডেটাবেসের অংশ হওয়ায় এটি নিজে থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তবে সচেতন নাগরিক হিসেবে আধার বায়োমেট্রিক লক রাখা এবং প্রয়োজনে মাস্কড আধার ব্যবহার করার মাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তার সম্পূর্ণ সুফল পাওয়া সম্ভব।