Great Nicobar Island। গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ কী চিনের বিরুদ্ধে ভারতের ‘হরমুজ প্রণালী’?

Spread the love

ভারতের সর্ব দক্ষিণ প্রান্তের গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ দেশের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের বেশি কাছাকাছি অবস্থিত। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এই দ্বীপ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেতৃত্বাধীন সরকার গ্রেট নিকোবরকে ভারত মহাসাগরে অন্যতম প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক তল্লাশি চৌকি কিংবা ঘাঁটিতে পরিণত করার জন্য ১১ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছে।

কেন্দ্রীয় সরকার গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ১৬৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে একটি আন্তর্জাতিক কনটেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল, বেসামরিক ও সামরিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পর্যটন অবকাঠামো এবং নতুন টাউনশিপ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। সরকারি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, দ্বীপে একটি বড় সমুদ্রবন্দর তৈরি করা হবে, যা ভারতকে সিঙ্গাপুর, কলম্বো ও ক্লাংয়ের মতো বিদেশি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে। তথ্য অনুযায়ী, গালাথিয়া বে এলাকায় প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক কনটেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনালের ধারণক্ষমতা হবে ১ কোটি ৪২ লক্ষ টিইইউ। পাশাপাশি ৪ হাজার পিক আওয়ার যাত্রী ধারণক্ষমতার গ্রিনফিল্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ৪৫০ এমভিএ গ্যাস ও সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ১৬ হাজার ৬১০ হেক্টর এলাকাজুড়ে নতুন জনপদ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

চিনের ‘মালাক্কা’ সমস্যা

ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দূরে মালাক্কা প্রণালীর পশ্চিম প্রবেশপথের কাছে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ অবস্থিত। এটি পূর্ব-পশ্চিমমুখী জাহাজ চলাচল রুটের সংলগ্ন, যা উপসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ এবং চিন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া-সহ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহ পরিবহনে ব্যবহার করা হয়। সিঙ্গাপুরের কাছে ফিলিপ চ্যানেলের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশে মাত্র ২.৮ কিলোমিটার চওড়া এই দ্বীপ। তবুও মধ্যপ্রাচ্যকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগকারী প্রধান জলপথ এটি। আর বিশ্ব বাণিজ্য এই প্রণালির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হলেও চিনের জন্য তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চিনের অপরিশোধিত তেল আমদানির ৮০ শতাংশ এবং বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশই এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ভৌগোলিক এই অবস্থান মালাক্কা প্রণালীর ওপর নজরদারি চালানোর জন্য গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জকে ভারতের সম্ভাব্য মূল্যবান প্রহরী করে তুলেছে। গ্রেট নিকোবর ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও সামরিক স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে ভারতেরও নিজের ভূকৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করা প্রয়োজন। গভীর সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হলে ভারত বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হবে এবং সামরিক নজরদারিতেও সুবিধা পাবে।

কৌশলগত অবস্থানের কারণে গুরুত্ব

গত মে মাসে এক বিবৃতিতে সরকার বলেছে, গ্রেট নিকোবর প্রকল্প ‘একটি কৌশলগত প্রকল্প; যা আন্দামান সাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের উপস্থিতি জোরদার করার লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে।’ এতে আরো বলা হয়েছে, ‘প্রকল্পটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা উপস্থিতি বৃদ্ধি, দ্বীপপুঞ্জের অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী এবং ওই অঞ্চলে সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য নকশা করা হয়েছে।’ এই প্রসঙ্গে সংবাদমাধম আল জাজিরা-কে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রাক্তন ভাইস চিফ শেখর সিনহা বলেন, ‘প্রণালীতে আসা-যাওয়া করা সব যানবাহনের ওপর নজর রাখার জন্য এই দ্বীপ চমৎকার এক জায়গা।’ সমুদ্রের কার্যক্রম শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের বিষয়ে নয়াদিল্লির সক্ষমতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এটি ভারতকে সামুদ্রিক নজরদারিতে বাড়তি সুবিধা দেবে।

ভারতের সামুদ্রিক সুবিধা

ভারতের কৌশলগত ও সামুদ্রিক শক্তিকে আরও মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে ‘গ্রেট নিকোবর প্রকল্প।’ চলমান এই প্রকল্পের লক্ষ্য গ্রেট নিকোবার দ্বীপ-কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করা। আন্তর্জাতিক পূর্ব-পশ্চিম নৌবাণিজ্য পথের কাছাকাছি অবস্থানের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিদেশি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের উপর ভারতের নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই বন্দরের অন্যতম বড় সুবিধা হল এটি আন্তর্জাতিক পূর্ব-পশ্চিম শিপিং রুট থেকে মাত্র ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত এবং এখানে প্রাকৃতিকভাবে ২০ মিটারেরও বেশি গভীর জল রয়েছে। এর ফলে বড় জাহাজের যাতায়াত সহজ হবে এবং ভারতকে কলম্বো, সিঙ্গাপুর এবং পোর্ট ক্লাং-এর মতো বিদেশি বন্দরের উপর নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে। প্রাক্তন সেনা আধিকারিক সঞ্জয় আইয়ার বলেন, ‘গ্রেট নিকোবর প্রকল্প সাম্প্রতিক দশকগুলিতে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ। এটি পূর্ব ভারত মহাসাগরে ভারতের স্থায়ী উপস্থিতি এবং নজরদারি ক্ষমতা বাড়াবে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বন্দরগুলিতে এখনও বড় জাহাজের জন্য পর্যাপ্ত গভীর জলের সুবিধা নেই। ফলে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহণ এখনও বিদেশি বন্দরের মাধ্যমে হয়, যার কারণে ভারতের বড় আর্থিক ক্ষতি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের বন্দরগুলিতে এখনও বড় জাহাজের জন্য পর্যাপ্ত গভীর জলের সুবিধা নেই। ফলে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহণ এখনও বিদেশি বন্দরের মাধ্যমে হয়, যার কারণে ভারতের বড় আর্থিক ক্ষতি হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *