পাকিস্তানের বাণিজ্যিক রাজধানী করাচিতে শনিবার বড়সড় জঙ্গি হামলার ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি সিন্ধ রেঞ্জার্সের প্রাদেশিক সদর দফতরে ঢুকিয়ে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরণের পরপরই নিরাপত্তাবাহিনী ও জঙ্গিদের মধ্যে তীব্র গুলির লড়াই শুরু হয়। ঘটনায় অন্তত চারজন সিন্ধ রেঞ্জার্স সদস্য নিহত হয়েছেন। পাল্টা অভিযানে ছয় জঙ্গিকে গুলি করে হত্যা এবং একজনকে জীবিত গ্রেফতার করার দাবি করেছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, করাচির গুলিস্তান-ই-জওহর এলাকার রেঞ্জার্স স্থাপনাকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরকভর্তি একটি গাড়ি ধাক্কা দেওয়া হয়। প্রবল বিস্ফোরণের পর গোটা এলাকা কেঁপে ওঠে এবং মুহূর্তের মধ্যেই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে মওসামিয়াত চৌরঙ্গি ও ইউনিভার্সিটি রোডের মেটিওরোলজিক্যাল চৌরঙ্গি এলাকায় আরও একটি বিস্ফোরণ এবং ব্যাপক গোলাগুলির খবর পাওয়া যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় র্যাপিড রেসপন্স ফোর্স, পুলিশ কমান্ডো এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে তল্লাশি অভিযান শুরু হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, হামলাকারীদের লক্ষ্য ছিল সিন্ধ রেঞ্জার্সের সদর দফতরে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো। তবে দ্রুত পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলায় হামলাকারীদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। দীর্ঘক্ষণ গোলাগুলির পর ছয় জঙ্গিকে হত্যা করা হয় এবং একজনকে জীবিত অবস্থায় আটক করা সম্ভব হয়েছে। আটক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হামলার পরিকল্পনা ও নেপথ্যের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
এই হামলার দায় স্বীকার করেছে **জামাত-উল-আহরার (JuA)**, যা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন **তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)**-এর একটি উগ্রপন্থী শাখা। সংগঠনটির দাবি, তাদের আত্মঘাতী ইউনিট **’খুলাফা-ই-রাশেদিন ইস্তিশহাদি ব্রিগেড’** এই হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে টিটিপি-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলি নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

ঘটনার পর সিন্ধের মুখ্যমন্ত্রী সৈয়দ মুরাদ আলি শাহ বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে রিপোর্ট তলব করেন। তিনি পুলিশ ও প্রশাসনকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে হামলার প্রকৃতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক বছরে পাকিস্তানে জঙ্গি হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে টিটিপি ও তাদের সহযোগী জঙ্গি সংগঠনগুলো। আফগানিস্তানে তালিবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উগ্রপন্থী তৎপরতা আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ ইসলামাবাদের। করাচির এই হামলাও সেই ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকটের সর্বশেষ উদাহরণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।নিরাপত্তা বাহিনী এখনও গোটা এলাকা ঘিরে তল্লাশি চালাচ্ছে। হামলায় জড়িত অন্য কোনও সদস্য পালিয়ে গেছে কি না বা এর সঙ্গে বৃহত্তর কোনও জঙ্গি নেটওয়ার্ক যুক্ত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলি।