ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে একেবারে ভরাডুবি হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তৃণমূলকে হারিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। তবে সেই পরাজয় স্বীকার করতে নারাজ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনে তৃণমূলের বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে বৃহস্পতিবার কালীঘাটের কার্যালয়ে সাংসদদের নিয়ে বৈঠক করলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেই একঝাঁক তারকা সাংসদ ও নেতার অনুপস্থিতি ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে জোর জল্পনা।
কালীঘাটের বৈঠকে অনুপস্থিত সাংসদরা
বৃহস্পতিবার বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সৌগত রায়, ডেরেক-ও ব্রায়েন-এর মতো প্রথম সারির হেভিওয়েট নেতারা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে অন্য একটি বিষয়। দলীয় সূত্রের খবর, এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে যোগ দেননি তারকা সাংসদ দেব (দীপক অধিকারী), রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, কোয়েল মল্লিক, বাবুল সুপ্রিয় এবং অরূপ চক্রবর্তীর মতো একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। যদিও বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা করতে নারাজ তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব। তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের দাবি, যে সাংসদরা অনুপস্থিত ছিলেন, তাঁরা সকলেই দলকে আগাম জানিয়েছিলেন, এ দিনের বৈঠকে তাঁরা থাকতে পারবেন না। কী কারণে তাঁরা অনুপস্থিত থাকবেন, তাও নেতৃত্বকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল আগে থেকে।
তৃণমূলের সংসদীয় টিমের বৈঠকে উপস্থিত এক সাংসদের কথায়, ‘রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদীশ বসুনিয়া, দেব, কোয়েল মল্লিক, রাজীব কুমার, কালীপদ সোরেন, মমতাবালা ঠাকুর- এঁদের বৈঠকে দেখতে পেলাম না। লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে আমাদের দলের মোট এমপি–র সংখ্যা এখন ৪২। এই বৈঠকে সবাই ছিলেন না। এই বিষয়ে বৈঠকে অবশ্য নেতৃত্ব তেমন কিছু বলেননি।’ এদিকে, কেন বৈঠকে আসতে পারলেন না, এই প্রশ্নের জবাবে কোচবিহারের জোড়াফুলের সাংসদ জগদীশ বসুনিয়া বলেন, ‘আমার ছেলে অসুস্থ। নার্সিংহোমে ভর্তি রয়েছে। ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত আছি, দলকে এটা জানিয়েছি। আগে পরিবার, পরে দল।’ কালীঘাটে মমতার নেতৃত্বে জোড়াফুলের বিধায়কদের নিয়ে যে দিন বৈঠক হয়েছিল সে দিনও একদল বিধায়ক অনুপস্থিত ছিলেন। সে সময়েও তৃণমূল নেতৃত্ব দাবি করেছিলেন, ওই বিধায়করাও যে বৈঠকে থাকতে পারবেন না, সে কথা নেতৃত্বকে আগাম জানিয়ে রেখেছিলেন তাঁরা।

তৃণমূলের সংসদীয় টিমের বৈঠক
তৃণমূলের সংসদীয় টিমের বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তৃণমূলের বর্ষীয়ান সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফের লোকসভায় জোড়াফুলের সচেতক করা হয়েছে। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভার দলনেতা পদ থেকে সরে যাওয়ার সময়ে কল্যাণ তৃণমূলের সচেতকের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলেন। সেই সময়ে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে লোকসভায় তৃণমূলের সচেতক করা হয়। সূত্রের খবর, বৈঠকের শুরুতেই কলকাতা হাইকোর্টে আইনি লড়াই নিয়ে কল্যাণের প্রশংসা করেন মমতা। পরে শ্রীরামপুরের সাংসদকে আগের দায়িত্ব ফিরিয়ে দেন। কল্যাণকে লোকসভার সচেতক করা হলেও রাজ্যসভার টিমে কোনও রদবদল করেননি তৃণমূলনেত্রী।
এই বিধানসভা নির্বাচনে কী ভাবে ‘ভোট চুরি’ করা হয়েছে, তার বিশদ ব্যাখ্যাও বৈঠকে দিয়েছেন মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের তরফে এটাও বলা হয়েছে যে, বিজেপির লোকেরা কেন্দ্রীয় বাহিনীর পোশাক পরে হামলা চালিয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশের দাবি করা হলেও নির্বাচন কমিশন তা করছে না। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে ‘ভোট চুরি’ ইস্যু নিয়ে আগামী দিনে তৃণমূল জাতীয় স্তরে সরব হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সৌগত রায়। বৈঠকের পরে প্রবীণ সাংসদ অভিযোগ করেন, ‘এখানে ভোট লুট হয়েছে। ইন্ডিয়া ব্লকের সবাই যোগাযোগ করছেন। এক সঙ্গে লড়াই হবে।’ কালীঘাটের বাড়িতে মমতা থাকাকালীন তৃণমূলের একদল ঘরছাড়া কর্মীও সেখানে আসেন। এই ঘরছাড়া কর্মীদের কথা শুনেছেন তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব। জোড়াফুল নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সর্বস্তরের নেতা-কর্মীকে আগামী দু’-চার দিনের মধ্যে জেলায় জেলায় প্রতিবাদ মিছিল করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।