প্রবল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কার্যত বিধ্বস্ত নেপাল। বুধবার চিন সীমান্তের কাছে ভোতে কোশি নদী উপত্যকা এলাকায় ভয়াবহ হড়পা বানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। রাসুয়া-সহ একাধিক এলাকায় নদীর জলের স্রোতে ভেসে গিয়েছে ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প-সহ গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৬০ হয়েছে। একই সঙ্গে এখনও নিখোঁজ শত শত মানুষ। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলা। হড়পা বান ও ধসের জেরে বহু এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারীরা কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জীবিতদের সন্ধান চালাচ্ছেন। বহু বাড়ির নিচের তলা কাদা ও পলিতে ঢেকে গিয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকাজও বাধার মুখে পড়েছে। খারাপ আবহাওয়া এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে দুর্গত এলাকায় দ্রুত পৌঁছনো কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই বিপর্যয়ে বিদেশি নাগরিকদের নিখোঁজ হওয়ার খবরও সামনে এসেছে। নেপাল পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। প্রাথমিক তালিকায় ১০৫ জন ভারতীয় নিখোঁজের কথা জানানো হলেও পরবর্তী বিভিন্ন সরকারি সূত্রে নিখোঁজ ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। অনেকেই কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার পথে ছিলেন।
বিপর্যয়ের কারণ নিয়েও তৈরি হয়েছে রহস্য। প্রথম দিকে ভূমিকম্পের জেরে তুষারধস বা ভূমিধস থেকে এই ভয়াবহ বন্যা হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা সংস্থা USGS জানিয়েছে, প্রাথমিক ভাবে ভূমিকম্প বলে মনে হওয়া সেই কম্পন আসলে হিমবাহ ধস এবং তার সঙ্গে যুক্ত ধসপ্রবাহের ফল। সেই বিপুল বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে এসে নদীতে ভয়াবহ স্রোত তৈরি করে এবং তার ফলেই নেপাল ও তিব্বতে ‘catastrophic’ বা বিপর্যয়কর প্রভাব পড়ে।
ভারতও পরিস্থিতির উপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে। কেন্দ্রীয় জল কমিশনের সতর্কতার ভিত্তিতে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা NDRF জানিয়েছে, ত্রিশূলী নদীতে হঠাৎ জলস্তর বৃদ্ধির খবর পাওয়া গিয়েছে এবং এর প্রভাবে গণ্ডক নদী দিয়ে বন্যার ঢেউ ভারতে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বিহার ও উত্তরপ্রদেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় NDRF-এর দল মোতায়েন করা হয়েছে এবং সীমান্তবর্তী এলাকার প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

এরই মধ্যে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সঙ্গে ফোনে কথা বলে প্রাণহানিতে শোকপ্রকাশ করেছেন এবং সবরকম মানবিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, ভারত ১০ টন মানবিক সহায়তা ও বিপর্যয় মোকাবিলার সামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ নেপালে পাঠিয়েছে।
নেপালের এই ভয়াবহ দুর্যোগে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আমেরিকা শোকপ্রকাশের পাশাপাশি জরুরি সহায়তা হিসেবে ৫ লক্ষ ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এখন মূল লক্ষ্য নিখোঁজদের দ্রুত উদ্ধার, দুর্গত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এবং আরও কোনও বিপর্যয় রুখতে নদী উপত্যকাগুলিতে নজরদারি বাড়ানো।