আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অপরিশোধিত তেলের দামে অস্বাভাবিক উত্থান এবং মার্কিন শুল্ক নীতির প্রভাবে শুক্রবার সকালে বড় ধাক্কা খেল ভারতীয় শেয়ার বাজার। সপ্তাহের শেষ ট্রেডিং সেশনে বাজার খুলতেই শুরু হয় ব্যাপক বিক্রি। ফলে সেনসেক্স ও নিফটি—দুই প্রধান সূচকই প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত নেমে যায়। বাজারে এই ধসের জেরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিনিয়োগকারীদের সম্পদের মূল্য প্রায় ৪ লক্ষ কোটি টাকা কমে যায়।
বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (বিএসই) ৩০ শেয়ারের সূচক সেনসেক্স একসময় ৮০০ পয়েন্টেরও বেশি পড়ে ৭৫,৫৩৫-এ নেমে আসে। একই সময়ে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (এনএসই) নিফটি ৫০ সূচক প্রায় ২৫০ পয়েন্ট হারিয়ে ২৩,৬১৯-এর দিনের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছায়। শুধু বড় সংস্থার শেয়ার নয়, মিডক্যাপ এবং স্মলক্যাপ সূচকেও প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত পতন দেখা যায়, যা বাজারজুড়ে বিক্রির চাপেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই বড় পতনের ফলে বিএসই-তে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির মোট বাজার মূলধন এক ধাক্কায় প্রায় ৪৭৭ লক্ষ কোটি টাকা থেকে কমে ৪৭৩ লক্ষ কোটি টাকায় নেমে আসে। অর্থাৎ, অল্প সময়ের মধ্যেই বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৪ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়।
বাজারে এই ধসের অন্যতম বড় কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের লাগাতার বৃদ্ধি। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম শুক্রবার ব্যারেলপিছু ১০১ ডলার ছাড়িয়ে যায়। চলতি সপ্তাহেই ব্রেন্ট ক্রুড প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে, আর গত সপ্তাহে বৃদ্ধি ছিল ১৬ শতাংশ। টানা তিন মাস পতনের পর শুধুমাত্র জুলাই মাসেই অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলার জেরে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জিওজিত ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ ভি. কে. বিজয়কুমারের মতে, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের উপরে চলে যাওয়া ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এতে চলতি হিসাবের ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি এবং কর্পোরেট মুনাফার উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এছাড়াও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছেন। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাজারে চাপ বাড়ানোর আরেকটি কারণ হল মার্কিন ১০ বছরের সরকারি বন্ডের ফলন (Bond Yield) বৃদ্ধি। এটি ৪.৭ শতাংশের উপরে উঠে যাওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারত-সহ উদীয়মান বাজার থেকে অর্থ তুলে নিরাপদ মার্কিন বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক (ট্যারিফ) নীতিও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সম্প্রতি ভারত-সহ ৬০টি বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের উপর ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন আমদানি শুল্ক ঘোষণা করেছে আমেরিকা। ভারতের উপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতি বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনীতির উপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।