ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কে এবার সরাসরি অবস্থান স্পষ্ট করল নয়াদিল্লি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, ঢাকার প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি নয়, দুটি পৃথক আমন্ত্রণ পৌঁছেছিল। একটি ছিল ভারত সফরের জন্য দ্বিপাক্ষিক আমন্ত্রণ এবং অন্যটি ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ‘আউটরিচ’ পর্বে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ। ফলে ব্রিকস নিয়ে ঢাকার তরফে যে ব্যাখ্যা সামনে এসেছিল, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। কারণ ঢাকার বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নাকি তারেককে ডাকেনি ভারত। তাই মুখ ফুলিয়ে বসেছিল তারা। সেই অজুহাতেই আবার ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিয়ে ভারতে না আসারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা। তবে তাদের ডাহা মিথ্যার পর্দা এবার ফাঁস হয়ে গেল।
মঙ্গলবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের সাপ্তাহিক সাংবাদিক বৈঠকে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। পরে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁকে ব্রিকস সম্মেলনেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। অর্থাৎ দুই ক্ষেত্রেই আমন্ত্রণ ছিল পৃথক এবং আনুষ্ঠানিক।
এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্রিকস সম্মেলন শুরুর আগে বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছিলেন, তারেক রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই কারণ দেখিয়েই ঢাকা জানিয়েছিল, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর যোগ দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছিল, তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর বহুপাক্ষিক কোনও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নয়, বরং দ্বিপাক্ষিক সফর হিসেবেই হওয়া উচিত।
কিন্তু নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই ব্যাখ্যাকে জটিল করে দিয়েছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক স্পষ্ট করেছে, বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ ছিল ঠিকই, কিন্তু তার পাশাপাশি তারেক রহমানকে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য আলাদা আমন্ত্রণও দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ শুধু ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ দেওয়া হয়নি’—এই বক্তব্য দিয়ে গোটা বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।
এখানেই ঢাকার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ ভারত সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতেই দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছিল এবং পরবর্তীতেও সেই আমন্ত্রণ বহাল ছিল। পরে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে আরেকটি আমন্ত্রণ জানানো হয়। অর্থাৎ দিল্লির তরফে বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগের দরজা একাধিক স্তরেই খোলা রাখা হয়েছিল।

ভারতের দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বিমসটেক মূলত বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বাংলাদেশ বর্তমানে সংগঠনটির চেয়ারম্যান হওয়ায় তারেক রহমানকে সেই পরিচয়ে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো কূটনৈতিকভাবেও অস্বাভাবিক নয়। একইসঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে ভারত দুই দেশের সরাসরি সম্পর্ককেও গুরুত্ব দিয়েছে।
তাই ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি এখন শুধু একটি আন্তর্জাতিক বৈঠকে যোগ না দেওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঢাকা-নয়াদিল্লির কূটনৈতিক বার্তাও। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে কারণ দেখানো হয়েছিল, ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্যে তার সঙ্গে নতুন তথ্য যুক্ত হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—ঢাকা কি আমন্ত্রণের প্রকৃতি নিয়ে বিষয়টিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করে তুলেছিল? নাকি দু’দেশ একই ঘটনাকে ভিন্ন কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করছে?তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—নয়াদিল্লি এখনও তারেক রহমানের দ্বিপাক্ষিক ভারত সফরের দরজা বন্ধ করেনি। বরং ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সেই আমন্ত্রণ বহাল রয়েছে। এখন নজর থাকবে ঢাকার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।