সায়েন্স ডেইলি-তে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, মানব সভ্যতার ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে। ইজরায়েলের একটি গুহায় পাওয়া নতুন প্রমাণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ১ লক্ষ ১০ হাজার বছর আগে নিয়ান্ডারথাল এবং হোমো সেপিয়েন্স কেবল সহাবস্থানই করেনি, বরং তারা একে অপরকে সাহায্যও করত।
এতদিন পর্যন্ত ধারণা করা হতো যে, আধুনিক মানুষ (Homo sapiens) এবং নিয়ান্ডারথালদের (Neanderthals) মধ্যে সম্পর্ক ছিল কেবল টিকে থাকার লড়াই বা প্রতিযোগিতার। কিন্তু ইজরায়েলের ‘তিনশেমিত’ (Tinshemet) গুহায় পাওয়া নতুন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সেই পুরনো ইতিহাসকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করছে। জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটি এবং তেল আভিভ ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, এই দুই ভিন্ন প্রজাতির মানুষ একে অপরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখত, এমনকি তাদের প্রযুক্তি ও জীবনযাত্রার কৌশলও ভাগ করে নিত।
তিনশেমিত গুহার বিস্ময়কর আবিষ্কার
ইজরায়েলের মধ্য অঞ্চলে অবস্থিত তিনশেমিত গুহায় ২০১৭ সাল থেকে খননকার্য চলছে। গবেষকরা সেখানে এমন কিছু সমাধিস্থল বা ‘বুরিয়াল সাইট’ খুঁজে পেয়েছেন যা গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই গুহাটি প্রমাণ করে যে, ১ লক্ষ ১০ হাজার বছর আগে লেভান্ত (Levant) অঞ্চলটি ছিল মানব বিবর্তনের একটি ‘মেল্টিং পট’ বা মিলনস্থল।

সহাবস্থান নয়, ছিল সহযোগিতা
গবেষণাপত্রটি ‘নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার’ (Nature Human Behaviour) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, নিয়ান্ডারথাল এবং হোমো সেপিয়েন্সরা কেবল একই ভৌগোলিক এলাকায় থাকত না, বরং তাদের মধ্যে সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগ ছিল। গবেষকরা চারটি প্রধান ক্ষেত্রে এই সহযোগিতার প্রমাণ পেয়েছেন:
১. পাথরের অস্ত্র নির্মাণ: উভয় প্রজাতিই একই ধরণের উন্নত কৌশল ব্যবহার করে পাথরের অস্ত্র তৈরি করত।
২. শিকারের কৌশল: তারা দলবদ্ধভাবে বড় পশু শিকারের পরিকল্পনা ও কৌশল বিনিময় করত।
৩. প্রতীকী ব্যবহার: গুহার ভেতর প্রচুর পরিমাণে ‘গেরুয়া’ (Ochre) রঙের রঞ্জক পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, তারা নিজেদের শরীর সাজাতে বা একে অপরের থেকে নিজেদের আলাদা পরিচয় দিতে এই রং ব্যবহার করত।
৪. সমাধি রীতি: অবাক করার মতো বিষয় হলো, উভয় প্রজাতিই মৃতদেহ সৎকারে একই ধরণের রীতি অনুসরণ করত। মৃতদেহের সাথে পাথরের হাতিয়ার ও পশুর হাড় রাখা ছিল তাদের অভিন্ন ঐতিহ্যের ইঙ্গিত।
বিবর্তনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া আবিষ্কার
হিব্রু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়োসি জাইদনার বলেন, “আমাদের তথ্য প্রমাণ করে যে, বিচ্ছিন্নতা নয় বরং পারস্পরিক যোগাযোগই আদি মানুষের সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মূল চালিকাশক্তি ছিল।” এই গবেষণার মাধ্যমে জানা যায় যে, লেভান্ত অঞ্চলটি ছিল মানব বিবর্তনের এক বিশাল সংযোগস্থল। বিভিন্ন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই এলাকায় যখন খাদ্য ও আশ্রয়ের প্রাচুর্য ঘটে, তখনই বিভিন্ন মানব প্রজাতির মধ্যে এই নিবিড় যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
প্রাচীন বন্ধু
তিনশেমিত গুহার এই নিদর্শন আমাদের শেখায় যে, প্রাচীনকালে মানুষ হিংসা বা প্রতিযোগিতার চেয়ে বরং সহযোগিতার মাধ্যমেই প্রতিকূল পরিবেশ জয় করেছিল। বর্তমান আধুনিক মানুষের ডিএনএ-তে থাকা নিয়ান্ডারথালদের অংশবিশেষ আসলে সেই প্রাচীন বন্ধুত্বেরই এক জীবন্ত স্মৃতি।