শনিবার সোনারপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর নজিরবিহীন হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আক্রান্ত হলেন শ্রীরামপুরের তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। রবিবার সকালে হুগলির চণ্ডীতলা থানায় ডেপুটেশন জমা দিতে গিয়ে মাথায় ঢিল লেগে গুরুতর আহত হন তিনি। আচমকা মাথায় আঘাত পাওয়ায় চোট পেয়ে সেখানেই মাটিতে বসে পড়েন এই প্রবীণ তৃণমূল নেতা। এরপরেই সাংসদকে ঘিরে থাকা তৃণমূল কর্মীরা দ্রুত শুশ্রূষা করেন। কিছুটা সুস্থ বোধ করার পর কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় চণ্ডীতলা থানার সামনে অবস্থান বিক্ষোভে বসেন। তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার জেরে চণ্ডীতলা থানা চত্বরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। তৃণমূল সাংসদ এই হামলার জন্য সরাসরি বিজেপির দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার সোনারপুরে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে জনরোষ ও হামলার শিকার হয়েছিলেন, তারই প্রতিবাদে রবিবার সকালে চণ্ডীতলা থানায় দলীয় কর্মীদের নিয়ে ডেপুটেশন জমা দিতে গিয়েছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। থানার সামনে বসে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন তিনি। অভিযোগ, বিক্ষোভ চলাকালীন আচমকাই সেখানে একদল লোক এসে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে কালো পতাকা দেখাতে শুরু করে। একই সঙ্গে তাঁকে উদ্দেশ্য করে ‘চোর-চোর’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, এই উত্তেজনার মাঝেই আচমকা দূর থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে ইট-ঢিল ছোড়া হতে থাকে। তার মধ্যেই একটি বড় ঢিল সরাসরি এসে লাগে তাঁর মাথায়। তীব্র চোট পেয়ে তিনি মাটিতে পড়ে যান। দলীয় কর্মীরা তড়িঘড়ি তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

এই ঘটনার পরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট দাবি করেন, ‘পরিকল্পিতভাবে বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীরা এই হামলা চালিয়েছে। কালো পতাকা দেখানোর আড়ালে খুনের উদ্দেশ্যে ঢিল ছোড়া হয়েছে।’ তৃণমূল সাংসদ বলেন, ‘শুভেন্দু অধিকারী খুনি মুখ্যমন্ত্রী। স্বেচ্ছাচারী। যে কোনও উপায়ে (আমাদের) মেরে ফেলতে চায়। বাংলার মানুষের কাছে আবেদন, আপনারা সচেতন হন। আজ আমায় মারছে, আপনি দূর থেকে দেখছেন। কাল বিজেপির গুণ্ডারা আপনার মেয়েকে যখন টেনে ধরবে, তখন আপনাদের পাশে কেউ থাকবে না। যত দিন তৃণমূল রয়েছে, যত দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রয়েছেন, তত দিন আমরা লড়াই করে যাব।’ পাশাপাশি, তিনি আঙুল তুলেছেন পুলিশের দিকেও। তৃণমূল নেতা বলেন, ‘শুভেন্দু মাইনে দেন না। আইসি ইচ্ছা করে আমাকে মার খাওয়ালেন।’ তার পরেই রাজ্যবাসীর কাছে কল্যাণ আবেদন করে বলেন, ‘ভাল থাকুন। সুস্থ থাকুন। কিন্তু প্রতিবাদ করুন। বাংলার মানুষ প্রতিবাদ করুন। বাংলা গুণ্ডাদের হাতে চলে গিয়েছে। স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। প্রতিবাদ করুন, যে যেখানে রয়েছেন। আমাদের দলে কিছু লোক রয়েছেন, যাঁরা কবিতা লেখেন। বিজেপির চামচাগিরি করেন। তাঁদের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করুন।’ থানার সামনে অবস্থানরত কল্যাণের সঙ্গে এক পুলিশ আধিকারিক কথা বলতে এলে তিনি বলেন, ‘একজন সিআইএসএফ জওয়ানের জন্য বেঁচে গিয়েছি। রাজ্য পুলিশের হাতে বাঁচব না। এমপিদের প্রিভিলেজ রয়েছে, তা কী পুলিশ জানে!’ থানায় গিয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন কল্যাণ।
এদিকে, হুগলি গ্রামীণ পুলিশ সুপার কুমার সানি রাজ জানিয়েছেন, কোনও মারপিটের ঘটনা ঘটেনি। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় একটা অভিযোগ জমা দিয়েছেন। খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজ দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের তোলা এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। তাদের দাবি, এই ঘটনার সঙ্গে বিজেপির কোনও যোগ নেই। ক্ষমতার সমীকরণ বদলাতেই সাধারণ মানুষ এখন তৃণমূল নেতাদের দেখলেই স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। তবে শনিবারের পর রবিবারের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হুগলি তথা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে পারদ চড়তে শুরু করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চণ্ডীতলা থানা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।