জয়পুরে ফটোশুটের ‘গোলাপি হাতি’-র মৃত্যু

Spread the love

হাতি ছাড়া এ রাজ্যের কথা ভাবাই যায়না। রাস্তা থেকে শুরু করে গয়না, প্রাচীন শিল্পকলা, সর্বত্র হাতির দেখা পাওয়া যায়। সেই রাজস্থানের জয়পুরে একটি ফটোশুটকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। জুলিয়া বুরুলেভা নামে এক রাশিয়ান ফটোগ্রাফার প্রজেক্টের জন্য একটি হাতিকে উজ্জ্বল গোলাপি রঙে রাঙিয়ে তুলেছেন। আর সেই ছবি ভাইরাল হতেই পশুপ্রেমী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বন্য প্রাণীর সুরক্ষা এবং শিল্পের নামে পশুকে সাজানোর নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নেটিজেনদের একাংশ।

এনডিটিভি-র প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায় এক বছর আগে জয়পুরের একটি পরিত্যক্ত মন্দিরের সামনে এক বিদেশি ফটোগ্রাফার এই ফটোশুটটি করেছেন। সেখানে দেখা গিয়েছে একটি হাতিকে আপাদমস্তক গোলাপি রঙে রাঙানো হয়েছে। হাতির পিঠের উপর এবং পাশে মডেলকে রেখে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছবি তোলা হয়েছে। এই ফটোশুটের পরিকল্পনা হুট করে করা হয়নি। বরং বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলেছিল এর প্রস্তুতি। সঠিক লোকেশন খোঁজা, প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া এবং হাতির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই আয়োজন করা হয়। ফটোগ্রাফার নিজেই জানিয়েছেন, যে এটি তাঁর একটি বড় প্রজেক্ট ছিল। হাতিটির নাম ছিল চঞ্চল। যেটি হাতিগাঁও (হাতির গ্রাম) এলাকার বাসিন্দা। হাতিগাঁও কমিটির সভাপতি বাল্লু খান জানিয়েছেন, হাতিটির গায়ে গুলাল দিয়ে রঙ করা হয়েছিল-যা হোলির সময় ব্যবহৃত হয়। আর সেই রঙ ৩০ মিনিটের মধ্যেই ধুয়ে ফেলা হয়েছিল।

তিনি আরও জানিয়েছেন, প্রায় ৭০ বছর বয়সি চঞ্চল গত মাসে মারা গেছে। তবে, হাতিটির মৃত্যুর সঙ্গে ফটোশুট বা তাকে ঘিরে তৈরি বিতর্কের কোনও যোগসূত্র ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কর্মকর্তা ও স্থানীয় তত্ত্বাবধায়করা স্পষ্ট জানিয়েছেন, চঞ্চল নামের হাতিটির বয়স ছিল প্রায় ৭০ বছর-যা একটি হাতির জন্য তুলনামূলক বেশি। মনে করা হচ্ছে যে তার মৃত্যু স্বাভাবিক কারণেই হয়েছে। তা সত্ত্বেও পশু অধিকার কর্মীদের মত, ফটোশুটের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা এ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা হাতির জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। কোনও পশুকে সাজানো বা পোজ দেওয়ানোর ফলে তারা মানসিক চাপের শিকার হয় বলেই জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এই ধরণের কাজকে শিল্পের বদলে ‘পশু নিগ্রহ’ হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

বিতর্ক

২০২৫ সালের নভেম্বরে রাশিয়ান ফটোগ্রাফার জুলিয়া বুরুলেভা জয়পুরের একটি পরিত্যক্ত গণেশ মন্দিরের সামনে এই ফটোশুটটি করেছেন। সেখানে দেখা যায়, একটি হাতির পিঠে বসে রয়েছেন মডেল। পরনে অতি স্বল্প পোশাক। দেহের অনাবৃত অংশ পুরোটাই গোলাপি রঙে রাঙিয়ে নেন তিনি। একই কাণ্ড করেন হাতিটির সঙ্গেও। ভিডিওতেই দেখা যায়, একটি হাতির সারা গায়ে লাগানো হচ্ছে গোলাপি রং। গোলাপি হাতির পিঠে উঠে প্রচুর ছবি তুলেছেন মডেল, জুলিয়া সেগুলিও পোস্ট করেন ইনস্টাগ্রামে। গণেশ মূর্তির কথা মাথায় রেখেই ওই পরিত্যক্ত মন্দিরের সামনে হাতির সঙ্গে ফটোশুট করেছেন জুলিয়া।এমনটাই মত তাঁর। ইনস্টাগ্রামে তিনি লিখেছেন, ‘সেখানে সর্বত্র হাতি – রাস্তায়, অলঙ্কারে, স্থাপত্যে। বলতে গেলে রাজস্থানের প্রধান প্রতীক। একটি হাতিকে অন্তর্ভুক্ত না করে আমি চলে আসতে পারলাম না।’

ফটোগ্রাফারের ব্যাখ্যা সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ মানুষ তাঁর উপর ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, শিল্পের নামে একটি অবলা প্রাণীকে কষ্ট দেওয়ার অধিকার কারও নেই। হাতির মতো স্পর্শকাতর প্রাণীকে নিছক ‘প্রপ’ হিসেবে ব্যবহার করায় নিন্দার ঝড় চারিদিকে। ভারতে হাতি একটি সংরক্ষিত প্রাণী এবং তাদের বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কড়া নিয়ম রয়েছে। এই ধরণের ফটোশুটের জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল ক না, তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। নিয়ম লঙ্ঘন হলে ফটোগ্রাফারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র বিতর্কের পর রাজস্থান বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন লঙ্ঘিত হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তাঁরা আরও জানান যে, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনে কোনও অবহেলা বা লঙ্ঘন পাওয়া গেলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *