রবিবারই না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন টলিপাড়ার অন্যতম খ্যাতনামা অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়। শেষযাত্রায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল গোটা টলিউড। এমন একটা মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না ইন্ডাস্ট্রি থেকে তাঁর অনুরাগীরা। বারবার সামনে আসছে, শ্যুটিং ফ্লোরের নিরাপত্তার অভাব, অব্যবস্থা, গাফিলতি। কী করে জলে ডুবে গেলেন রাহুল? কার দোষে অকালেই বাবা হারা হল সহজ? বাংলা ইন্ডাস্ট্রি হারাল এত ভালো একজন অভিনেতাকে? বহু প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে। মিডিয়ার তরফ থেকেও বারংবার তুলে ধরা হচ্ছে অসংগতি, যা উঠে এসেছে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’-র পরিচালক থেকে শুরু করে সহ-অভিনেতা, ইউনিটের সদস্য, খোদ লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের কথাতে।
প্রথমত, মিডিয়াকে দেওয়া বিবৃতিতে ধারাবাহিকের পরিচালক এবং সহ-অভিনেতা বলছেন শ্যুটিং চলাকালীন রাহুল জলে ডুবে যায়। অন্যদিকে ম্যানেজার বলছেন প্যাক-আপের পরে ঘটনাটা ঘটে। ম্যানেজার তখন হোটেলে ছিলেন। কেন এই অসংগতি?
দ্বিতীয়ত, দীঘা ও তালসারি পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাহুল ও ধারাবাহিকের নায়িকা শ্বেতা যখন জলে ডুবে যায়, তখন ড্রোন শট নেওয়া চলছিল। এদিকে, লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের দাবি সমুদ্রে নামার কোনো শটই নাকি ছিল না!
তৃতীয়ত, লাইফ সেভিং গার্ড, ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল টিম কেন ছিল না আউটডোর শ্যুটে? যেখানে সমুদ্রের ধারে শ্যুট করা হচ্ছে। কারণ প্রত্যক্ষদর্শী থেকে শুরু করে, সিরিয়ালের সদস্যরা সকলেই বলেছেন, সমুদ্র থেকে উদ্ধার করার পরেও, বেঁচে ছিলেন রাহুল। যদি স্পটেই আপৎকালীন চিকিৎসা হত, তাহলে হয়তো এভাবে অকালে চলে যেতে হত না তাঁকে!
কার কথা বিশ্বাস করা হবে? এত বড় একটা ঘটনার বিচার হবে তো? নাকি ধামাচাপা পড়ে যাবে? একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলে দিয়েই অস্তাচলে অরুণোদয়। হয়তো ভবিষ্যতে এই ঘটনার কথা মাথায় রেখে, আরও সাবধানে হবে শ্যুটিং।

রাহুলের গাড়ি চালকের বক্তব্য:
ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট অনুসারে, ফুসফুসের ভিতরে অস্বাভাবিক পরিমাণে পাওয়া গিয়েছে বালি এবং নোনা জল। এমনকী, রাহুলের খাদ্যনালি, শ্বাসনালি, পাকস্থলির ভিতরেও বালি ঢুকে গিয়েছে। ফুসফুস ফুলে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে! অনেকক্ষণ জলে ডুবে থাকলেই এমনটা হয়। অন্তত ঘণ্টাখানেক। কেন এত দেরি হল রাহুলকে উদ্ধার করতে? মুখ খুলেছেন গাড়ির রাহুলের গাড়ির চালক, যিনি বিগত ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘দাদাকে’ আগলে রাখছেন।
বাবলু দাস জানান, এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে তা কেউই বুঝতে পারেননি। রাহুল নিজেও জলের গভীরতা আন্দাজ করতে পারেননি। প্রথমে হাঁটুসমান জলে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি, কিন্তু আচমকাই পরিস্থিতি বদলে যায়। বাবলুর কথায়, ‘একসময় দেখলাম শুধু মাথাটা ভাসছে। সঙ্গে সঙ্গে টেকনিশিয়ানরা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে।’
তিনি আরও জানান, শ্যুটিংয়ের জায়গায় পৌঁছতে একটি মোটরবোট ব্যবহার করা হচ্ছিল। রাহুল ডুবে যেতে শুরু করলে দ্রুত সেই বোট কাছে আনা হয় এবং আশেপাশের নৌকাগুলোকেও ডাকা হয়। কিন্তু সেই জায়গায় জলের স্রোত ছিল অত্যন্ত প্রবল। রাহুল বারবার উপরে ওঠার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু স্রোত তাঁকে আবার টেনে নিচে নিয়ে যাচ্ছিল। বাবলুর কথায়, ‘একটু সুযোগ পেলেই হয়তো তাঁকে বাঁচানো যেত, কিন্তু সেই সুযোগটাই পাওয়া যায়নি। ততক্ষণে জোয়ার এসে জল আরও বেড়ে গেছে।’ ঘটনার সময় প্রথমে নায়িকাকে জল থেকে উদ্ধার করা হয়, কিন্তু রাহুলকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বহু চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে উদ্ধার করতে দেরি হয়ে যায় এবং তিনি তলিয়ে যান।
তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয়, সেটে কি কোনো চিকিৎসক ছিল? তাঁর অকপট জবাব, ‘কখনোই চিকিৎসক থাকে না।’