ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর এক ধরনের স্বস্তি দেখা যায় পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের সমর্থকদের মাঝে। তাদের আশা ছিল, কারাবন্দি ইমরানকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে পিটিআই সমর্থকদের সেই আশা দ্রুতই হতাশায় পরিণত হয়। কারণ উদ্যোগ নেয়া তো দূরের বিষয়, ট্রাম্পের বিবেচনায়ও এমন কিছু আছে কি না, তা-ও নিশ্চিত নয়। ফলে, ইমরান খানের ভবিষ্যৎ কী হবে– পাকিস্তানের অন্যতম বড় এই রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি আরও শক্তভাবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। এই ধারা ২০২৬ সালেও অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা তাদের।পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব লেজিসলেটিভ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি (পিআইএলডিএটি)-এর চেয়ারম্যান আহমদ বিলাল মেহবুব মনে করেন, ২০২৬ সালে পাকিস্তানের তথাকথিত ‘হাইব্রিড সিস্টেম’ আরও শক্তিশালী হবে।
পাক সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনকে তিনি বলেছেন, শাসনব্যবস্থার এই হাইব্রিড মডেলটি এখন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে এবং আগামীতে আরও সংহত হবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
বিলাল মেহবুব বলেন,
গত এক বছরে বিচার বিভাগ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তনগুলো দেখা গেছে তা সাময়িক নয় এবং এগুলো নিরাপত্তাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা যে আরও দৃঢ় হতে পারে তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সামরিক প্রতিষ্ঠানের সমর্থনে বর্তমান সরকার ২০২৫ সালে একাধিক সাংবিধানিক সংশোধনী আনে, যার ফলে শাসনব্যবস্থা ও ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনও ঘটে।
অন্যদিকে, জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাইগাম খান ২০২৫ সালকে শেহবাজ সরকারের জন্য একটি ‘সৌভাগ্যের বছর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এর পেছনে মূলত অনুকূল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ভূমিকা ছিল। তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ডের ফলে আঞ্চলিক ঘটনাপ্রবাহে নিরাপত্তার দিক থেকে পাকিস্তানের গুরুত্ব বেড়েছে, বিশেষত আরব বিশ্বের কাছে।
জাইগাম খানের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে পাকিস্তান একটি ‘নিরাপত্তা সরবরাহকারী’ দেশ এবং ‘উদীয়মান মধ্যম শক্তি’ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ‘২০২৬ সালের মূল চ্যালেঞ্জ হবে এই ভূ-কৌশলগত অর্জনগুলোকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপান্তর করা।’

তবে মানবাধিকার কমিশন অব পাকিস্তানের মহাসচিব হারিস খালেক সতর্ক করে বলেছেন, ২০২৬ সালে ক্ষমতার আরও কেন্দ্রীকরণ নাগরিক স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তিনি বলেন,
২০২৬ সালে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক অবক্ষয় অব্যাহত আছে। সুশাসন, আইনের শাসন এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এখনও চাপের মুখে।
তিনি এক্সপ্রেস ট্রিবিউনকে আরও বলেন,
রাতারাতি কিছু বদলাবে না, কিন্তু ক্ষমতা কেন্দ্রগুলোকে বুঝতে হবে যে অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও ভিন্নমত দমন খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।
পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে এবং ৮৮ শতাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত আয়ের চেয়েও কম উপার্জন করে বলেও উল্লেখ করেন হারিস খালেক। তার মতে, নিরাপত্তা, শাসন ও উন্নয়ন নীতিতে বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রয়োজন। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ভূখণ্ডগত নিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব নয়।তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘অর্থবহ রাজনৈতিক সংলাপ অত্যন্ত জরুরি। ক্ষমতাসীনদেরই এই প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে, তবে পিটিআইকেও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ দেখাতে হবে।’
ইমরান খানের ভবিষ্যৎ
ইমরান খানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জাইগাম খানের ধারণা, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরেও এক্ষেত্রে তেমন কোনো বড় পরিবর্তন আসবে না, যদি না বাহ্যিক চাপ বা পিটিআইয়ের কৌশলে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে এবং দলটি বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
পিআইএলডিএটি-এর চেয়ারম্যান আহমদ বিলাল মেহবুব মনে করেন, পিটিআই প্রতিষ্ঠাতার ভবিষ্যৎ অনেকটাই তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
তিনি বলেন,
যদি তিনি (ইমরান খান) বিক্ষোভ ও সংঘাতের পথে থাকেন, তাহলে সমঝোতার সম্ভাবনা কম। তবে সংলাপের পথে এলে তার এবং তার দলের ওপর চাপ কমতে পারে।
মেহবুব আরও বলেন, ‘পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনই (২০২৯ সালে বা তার কিছু আগে অনুষ্ঠিত হতে পারে) ইমরান খানের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রকৃত পরীক্ষা হবে। এর আগে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত খুবই কম।’